এক সময় ক্রিকেট মানেই ছিল লর্ডসের আভিজাত্য আর ব্রিটিশদের দাপট। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সেই ‘সাদা চামড়ার’ শাসন এখন ইতিহাস। বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি এখন কার্যত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিসিআই’র একটি আজ্ঞাবহ ‘সাব-অফিস’।
প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ থেকে শুরু করে অর্থের চাবিকাঠি—সবই এখন দিল্লির একক নিয়ন্ত্রণে। একে এখন আর অংশীদারিত্ব বলা চলে না, এ যেন এক সুপরিকল্পিত ‘দখলদারিত্ব’।
আইসিসির ইতিহাসে এই প্রথম প্রশাসনের দুই প্রধান স্তম্ভ একই দেশের। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জয় শাহ আইসিসির চেয়ারম্যান হিসেবে সিংহাসনে বসার পর থেকেই বিসিসিআইর সার্বভৌমত্ব বিশ্ব ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সেই আধিপত্যের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকা হয়েছে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে, যখন ভারতীয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সংযোগ গুপ্ত সিইও পদে আসীন হয়েছেন। ফলে আইসিসির যাবতীয় ফাইল এখন দিল্লির গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া নড়ে না।
নীতি নির্ধারণী টেবিলে ভারতীয়দের দাপট
মাঠের আইন হোক কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো, সর্বত্রই এখন ভারতীয়দের আধিপত্য। আইসিসির সিএফও অঙ্কুর খান্না এবং ফিন্যান্স কমিটির প্রভাবশালী সদস্য দেবাজিত সাইকিয়া দুজনেই ভারতের। তারা অর্থ চেয়ারে বসে আইসিসির প্রতিটি ডলার যেন ভারতের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে তা দেখেন।
এ ছাড়াও মাঠের সিদ্ধান্তের কারিগর হিসেবে আইসিসিতে রয়েছেন সৌরভ গাঙ্গুলী এবং অরুণ সিং ধুমাল। অন্যদিকে, অডিট কমিটির প্রধান হিসেবে রয়েছেন ভারতের বিজয় মালহোত্রা।
তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে , নিয়ন্ত্রক এবং নিরীক্ষক—উভয় পক্ষই এখন একই শিবিরের লোক।
বিশ্ব ক্রিকেটের আয়ের সিংহভাগ আসে ভারতের বিশাল বাজার থেকে। এই অজুহাতে আইসিসির মোট লভ্যাংশের প্রায় ৩৯ শতাংশ (৩৮.৫%) একাই হাতিয়ে নিচ্ছে ভারত। অলিম্পিকে ক্রিকেট ঢোকানো থেকে শুরু করে বড় টুর্নামেন্টের সূচি—সবই সাজানো হচ্ছে ভারতীয় দর্শকদের সময় আর বাণিজ্যিক স্বার্থকে মাথায় রেখে।
এই ‘ভারতীয় বিজনেস মডেল’-এর ভিড়ে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এখন কেবল দাবার ঘুঁটি। তাদের ভূমিকা এখন কেবল ভারতের ঠিক করে দেওয়া ছকে অংশগ্রহণ করা।
লর্ডসের সেই পুরোনো আভিজাত্যকে ধুলোয় মিশিয়ে জয় শাহ এবং তার টিম প্রমাণ করে দিয়েছেন—বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বে ভারতের ‘দাদাগিরিই’ একমাত্র ধ্রুব সত্য। আইসিসি এখন কেবল একটি স্ট্যাম্প, যা বিসিসিআইর নেওয়া সিদ্ধান্তে আইনি সিলমোহর দেয়।



