ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

পাইলট : বাংলাদেশ ক্রিকেটের ‘আনসাং হিরো’

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম
খালেদ মাসুদ পাইলট। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের ক্রিকেটের শুরুর দিনগুলো ছিল সংগ্রামের, অনিশ্চয়তার আর বারবার ভেঙে পড়ার গল্পে ভরা। যখনই ব্যাটিং লাইনআপ তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে, যখনই পরাজয় ছিল অবশ্যম্ভাবী—ঠিক তখনই উইকেটের পেছনে গ্লাভস হাতে কিংবা ক্রিজে ব্যাট হাতে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন একজন মানুষ। তিনি খালেদ মাসুদ পাইলট।

আজ কিছু বিতর্কিত মন্তব্য ও প্রসঙ্গের প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠছে— সত্যিই এই মানুষটিকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে পেরেছে বাংলাদেশ?

১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি (বর্তমান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি) বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এক মাইলফলক। সেই টুর্নামেন্টে পাইলট ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য পারফর্মার। একজন উইকেটকিপার হয়েও পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দলের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যাটিং গড় ছিল তার।

সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে যখন বাংলাদেশ বিপর্যয়ের মুখে, তখন তার ৭০ রানের দায়িত্বশীল ইনিংসটি না থাকলে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন সেখানেই থেমে যেতে পারত।

আর ফাইনালে, শেষ মুহূর্তে যখন সমীকরণ কঠিন হয়ে উঠেছিল, তখন ৭ বলে ১৫ রানের সেই ছোট কিন্তু বিধ্বংসী ইনিংসটিই ম্যাচের ‘ডিফারেন্স’ গড়ে দেয়।

বাংলাদেশ ক্রিকেট যখন শৈশব পেরোচ্ছিল, তখন জাতীয় দলের কোচ ডেভ হোয়াটমোর তাকে ‘এশিয়ার সেরা উইকেটকিপারদের একজন’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন।

ভাঙাচোরা বোলিং আক্রমণ আর দুর্বল ফিল্ডিং ইউনিটের মাঝেও উইকেটের পেছনে তার দক্ষতা ছিল অনন্য। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দুই শতাধিক ডিসমিসালই তার ধারাবাহিকতা ও মানের প্রমাণ।

বাংলাদেশের অভিষেক টেস্ট ম্যাচেও পাইলট ছিলেন অবিচল এক ভরসা। চাপের মুহূর্তে ৩২ বলে ২১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে তিনি দেখিয়েছিলেন—এই দল লড়াই করতে জানে।

সে-সময়ে খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তোলার কারিগর ছিলেন পাইলট। হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ রফিক কিংবা আকরাম খানের সঙ্গে তার ছোট ছোট কিন্তু অমূল্য জুটিগুলো বহুবার বাংলাদেশকে বড় লজ্জা থেকে রক্ষা করেছে।

পরিসংখ্যানের পাতায় না থাকলেও সে সময়ে এসব ইনিংসই গড়ে দিয়েছিল দলের আত্মবিশ্বাস।

পাইলটের অবদান শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মাঠের বাইরেও তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। বিসিবির কাঠামোগত দুর্বলতা ও তৃণমূল পর্যায়ের স্থবিরতার সময়ে তিনি রাজশাহীতে গড়ে তুলেছেন ‘ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমি’।

এই একাডেমি থেকেই উঠে এসেছে জাতীয় দলের বর্তমান তারকা নাজমুল হোসেন শান্তর মতো ক্রিকেটার—যা পাইলটের দূরদৃষ্টি ও নিষ্ঠার উজ্জ্বল উদাহরণ।

যে মানুষটি নিজের ক্যারিয়ার, শ্রম আর পরবর্তী জীবন বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য উজাড় করে দিয়েছেন, তাকে যদি কেউ ‘নোবডি’ কিংবা অর্বাচীন শব্দে অপমান করে, সেটি শুধু একজন ব্যক্তিকে ছোট করা নয়—এটি পুরো দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতির জন্যই লজ্জাজনক।