ফুটবল বিশ্বে জালিয়াতির ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে জয়ের নেশায় নিজের শরীরকে রক্তাক্ত করে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর এমন ভয়ঙ্কর নজির ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই। ১৯৮৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিল ও চিলির মধ্যকার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের টিকিট পেতে সেই ম্যাচে চিলির জয় ছিল অপরিহার্য। অন্যদিকে ড্র করলেই চলত ব্রাজিলের। ১ লাখ ৪০ হাজার দর্শকের গর্জনে প্রকম্পিত মারাকানায় ম্যাচের ৪৯ মিনিটে ক্যারেকার গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল।
সময় যত গড়াচ্ছিল, চিলির বিশ্বকাপ স্বপ্ন তত ধূসর হয়ে আসছিল। তখনই শুরু হয় সেই কুখ্যাত নাটক, যা আজও রোজাস কেলেঙ্কারি নামে পরিচিত।
ম্যাচের ৬৭ মিনিটে হঠাত গ্যালারি থেকে একটি জ্বলন্ত ফ্লেয়ার (আতশবাজি) মাঠের ভেতর চিলির গোলরক্ষক রবার্তো রোজাসের ঠিক পাশে এসে পড়ে। ধোঁয়ায় চারপাশ আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার কয়েক মুহূর্ত পরই দেখা যায় রোজাস রক্তাক্ত অবস্থায় মাঠে লুটিয়ে পড়েছেন।
তার সারা মুখ রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। চিলির খেলোয়াড়রা তাৎক্ষণিক অভিযোগ তোলেন যে, ব্রাজিলের সমর্থকদের ছোড়া ফ্লেয়ারে তাদের গোলরক্ষক গুরুতর আহত হয়েছেন। নিরাপত্তার অজুহাতে তারা মাঠ ছেড়ে চলে যান এবং ম্যাচটি পরিত্যক্ত হয়।
প্রাথমিকভাবে ফুটবল বিশ্ব মনে করেছিল ব্রাজিল হয়তো বড় শাস্তির মুখে পড়বে। কিন্তু সত্য বেরিয়ে আসে ব্রাজিলিয়ান ফটোসাংবাদিক রিকার্ডো আলফিয়েরির তোলা ছবির মাধ্যমে। ল্যাবরেটরিতে প্রসেস করা সেই ছবিতে স্পষ্ট দেখা যায়, ফ্লেয়ারটি রোজাসের শরীর থেকে অন্তত এক মিটার দূরে মাটিতে পড়েছিল। অর্থাৎ, বাজির আগুনে রোজাস আহত হননি। তাহলে তার কপাল কাটল কীভাবে?
পরবর্তী তদন্তে ফিফা এক রোমহর্ষক সত্য জানতে পারে। গোলরক্ষক রবার্তো রোজাস আগে থেকেই তার গ্লাভসের ভেতর একটি ছোট রেজর ব্লেড লুকিয়ে রেখেছিলেন। পরিকল্পনা ছিল, গ্যালারি থেকে কিছু ছোড়া হলেই সেই সুযোগে নিজেকে আঘাত করে ম্যাচটি পণ্ড করে দেওয়া, যাতে পুনরায় অন্য মাঠে খেলা আয়োজন করা হয়।
রোজাস নিজেই স্বীকার করেন যে, ধোঁয়ার আড়ালে তিনি নিজেই নিজের কপাল চিরে ফেলেছিলেন। এই ষড়যন্ত্রে দলের কোচ এবং ডাক্তারও জড়িত ছিলেন।
এই জালিয়াতি ফাঁস হওয়ার পর চিলিকে বড় মাশুল দিতে হয়। ফিফা চিলিকে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করে এবং রবার্তো রোজাসকে ফুটবলে আজীবন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

