সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগানিস্তান দাসপ্রথা সম্পর্কিত আইন নিয়ে বেশ নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশটির আইনি কাঠামোতে এমন কিছু ধারণা পুনঃপ্রবর্তিত হয়েছে, যা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আফগান আইনের ইতিহাসে অনুপস্থিত ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো সরকারি আইনি ভাষায় আবারও ‘দাস’ শব্দটির অন্তর্ভুক্তি।
২০২৬ সালের গোড়ার দিকে তালেবান কর্তৃপক্ষ একটি নতুন ফৌজদারি আইন অনুমোদন করে, যেখানে একাধিক ধারায় স্পষ্টভাবে একজন ‘মুক্ত’ ব্যক্তি ও একজন ‘দাস’-এর মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কার্যত দাসত্বকে একটি আইনি শ্রেণি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এই আইনের ১৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো অপরাধে নির্দিষ্ট (হুদুদ) শাস্তি প্রযোজ্য না হলে তা বিবেচনাধীন শাস্তি (তা‘জির) দ্বারা দণ্ডনীয় হবে, ‘অপরাধী স্বাধীন হোক বা দাস’-এই ভাষ্য সব ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে দিয়েছে, আইনে ‘দাস’ শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে তালেবানরা আফগানিস্তানে বহু আগে বিলুপ্ত একটি সামাজিক ও আইনি মর্যাদাকে কার্যত পুনরুজ্জীবিত করছে। এই পদক্ষেপটি আফগানিস্তানের পূর্ববর্তী আইনি কাঠামোর সম্পূর্ণ বিপরীত। কয়েক দশক ধরে আফগান সংবিধান ও দণ্ডবিধি দাসত্বকে কোনোভাবেই স্বীকৃতি দেয়নি।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তালেবানরা প্রকাশ্যে দাসপ্রথায় ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়নি। তবুও আইনি গ্রন্থে ‘দাস’ শব্দটির অন্তর্ভুক্তি প্রতীকী ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। এটি আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং আধুনিক যুগে মুসলিম বিশ্বের গৃহীত ঐক্যমত্য থেকে বিচ্যুতির ইঙ্গিত দেয়, ঐক্যমত্য অনুযায়ী দাসত্ব মানবিক মর্যাদা ও ইসলামী নীতির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
বাস্তবে, বিশ্বব্যাপী এখন মুসলিম দেশসমূহসহ, দাসত্ব অবৈধ ও নিন্দিত বলে বিবেচিত। ফলে তালেবানদের এই পরিভাষাগত পুনরুজ্জীবন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়েই গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই অবস্থায় আফগানিস্তান কীভাবে এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে তা বোঝার জন্য দাসত্ব সংক্রান্ত দেশের আইনি ইতিহাস পর্যালোচনা করা অপরিহার্য।
ইসলামি আইনে দাসপ্রথা ও আফগান ইতিহাস
ইসলামি আইনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে, ধ্রুপদী শরিয়া সীমিত কিছু পরিস্থিতিতে দাসপ্রথার অনুমতি দিয়েছিল, মূলত যুদ্ধের ফলস্বরূপ। সুন্নি ও শিয়া উভয় ধারার আইনবিদরা ঐতিহাসিকভাবে একমত ছিলেন, বৈধ যুদ্ধে বন্দি অমুসলিমদের দাস করা যেতে পারে, তবে কোনো স্বাধীন মুসলমানকে দাস করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
সপ্তম শতাব্দী থেকে ইসলামি আইনশাস্ত্র দাসদের সঙ্গে আচরণ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিধান প্রণয়ন করে, তাদের নির্দিষ্ট অধিকার স্বীকার করে এবং দাসমুক্তিকে একটি পুণ্যময় কাজ হিসেবে উৎসাহিত করে।
কুরআন দাসদের প্রতি মানবিক আচরণের আহ্বান জানিয়েছে এবং স্বাধীনতা অর্জনের পথ নির্ধারণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, কুরআন ২৪:৩৩ আয়াতে প্রভুদেরকে দাসদের মুক্তি অর্জনের সুযোগ দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে।
প্রাক-আধুনিক মুসলিম সমাজে দাসপ্রথা একটি স্বীকৃত সামাজিক বাস্তবতা ছিল, এর মধ্যে বর্তমান আফগানিস্তানের অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে এই প্রথা ধর্মীয় নিয়ম দ্বারা সীমাবদ্ধ ছিল, মুসলমানকে দাস করা নিষিদ্ধ এবং দাসদের ওপর নির্যাতন আইনত দণ্ডনীয় ছিল।
আফগানিস্তানের ভূখণ্ডে, যা ঐতিহাসিকভাবে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সাম্রাজ্যিক পথের সংযোগস্থলে অবস্থিত, দাসপ্রথা এই বৃহত্তর ইসলামি কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হতো। দাসরা সাধারণত যুদ্ধবন্দি বা ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ছিলেন এবং গৃহকর্মী, শ্রমিক বা সৈনিক হিসেবে ব্যবহৃত হতেন। আমেরিকার কৃষিভিত্তিক দাসপ্রথার মতো বৃহৎ পরিসরের চাষাবাদ-নির্ভর দাসপ্রথা এখানে বিরল ছিল, যদিও দাস ব্যবসা এবং শোষণের ঘটনা ঘটত।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আফগান ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাসত্বের ঘটনা ঘটে হাজারা যুদ্ধের সময় (১৮৯১–১৮৯৩)। আমির আবদুর রহমান খানের বাহিনী হাজারা জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নৃশংস দমন-পীড়ন চালায়।
সে সময়ের বিবরণ অনুযায়ী, হাজারা জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষ হত্যা, বাস্তুচ্যুতি বা জোরপূর্বক দাসত্বের শিকার হয়। হাজার হাজার হাজারা পুরুষ, নারী ও শিশুকে কাবুল ও কান্দাহারের বাজারে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়। এই ঘটনাগুলো দেখায় যে দাসপ্রথা কীভাবে রাজনৈতিক ও জাতিগত নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
দাসপ্রথার বিলুপ্তিতে আফগানিস্তান
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আফগানিস্তানে এক মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা হয় রাজা আমানুল্লাহ খানের (১৯১৯–১৯২৯) শাসনামলে। তিনি দেশের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের পাশাপাশি আইনি ও সামাজিক আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নেন। মুসলিম বিশ্বের সমসাময়িক সংস্কার আন্দোলন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার নীতিকে প্রভাবিত করে।
১৯২৩ সালের প্রথম আফগান সংবিধানে দাসপ্রথা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। সংবিধানের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে ঘোষণা করা হয়, ‘আফগানিস্তানে দাসত্বের নীতি সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা হয়েছে। পুরুষ হোক বা মহিলা, কেউই অন্য কাউকে দাস হিসেবে নিয়োগ করতে পারবে না।’
এটি ছিল আফগান ইতিহাসে প্রথম জাতীয় আইন যা দাসত্ব ও দাস ব্যবসাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে। আমানুল্লাহ ও তার উপদেষ্টারা—যাদের মধ্যে বহু ইসলামি পণ্ডিত ছিলেন—যুক্তি দেন যে দাসপ্রথা বিলোপ শরিয়াহর মানবিক চেতনা ও ন্যায়বিচারের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই নীতি পরবর্তী শাসকরাও বজায় রাখেন। ১৯৩১ সালের সংবিধানসহ পরবর্তী সকল আফগান সংবিধানেই দাসত্ব নিষিদ্ধ রাখা হয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ দাসপ্রথা আফগান সমাজ থেকে কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং আইনি ও সামাজিক উভয় দিক থেকেই অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার ও আধুনিক ইসলামি ঐক্যমত্য
আফগানিস্তানের দাসপ্রথা বিলোপ আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। দেশটি ১৯২৬ সালের দাসপ্রথা কনভেনশন, ১৯৬৬ সালের সম্পূরক কনভেনশন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে যোগ দেয়। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বেও একটি বিস্তৃত ঐক্যমত্য গড়ে ওঠে যে দাসত্ব ইসলামি নীতিশাস্ত্রের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
আধুনিক ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, ইসলামের লক্ষ্য ছিল ধীরে ধীরে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করা এবং মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার কায়রো ঘোষণাপত্রসহ বহু নথিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
তালেবান যুগে বিতর্কিত প্রত্যাবর্তন
২০২৬ সালের তালেবান ফৌজদারি আইনে ‘দাস’ শব্দের পুনঃপ্রবর্তন তাই এক শতাব্দীর আইনি ঐতিহ্যের সঙ্গে একটি স্পষ্ট বিচ্ছেদ নির্দেশ করে। যদিও আইনে সরাসরি দাসত্ব বৈধ ঘোষণা করা হয়নি, তবুও এই পরিভাষা ব্যবহার করে একটি নিষিদ্ধ মর্যাদাকে আইনি কল্পনায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক আইন, আধুনিক ইসলামি ঐক্মত্য এবং আফগানিস্তানের নিজস্ব ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অতীতের নিপীড়নের স্মৃতি বহনকারী জনগোষ্ঠীর জন্য এই ভাষা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
সূত্র : তুর্কিয়ে টুডে

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন