ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্প্রতি সম্পাদিত বহুল আলোচিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) পূর্ণাঙ্গ ১৪ দফা অবশেষে প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েকদিন ধরে নথিটির বিস্তারিত গোপন রাখার কারণে সমালোচনা বাড়তে থাকলে বুধবার (১৭ জুন) মার্কিন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে এর বিষয়বস্তু জনসমক্ষে আনে।
মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা চুক্তির প্রধান বিষয়গুলো তুলে ধরে জানান, এতে হরমুজ প্রণালি দ্রুত চালু করা, ইরানের ওপর আরোপিত কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং বিটুইন দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা অ্যান্ড দ্য ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান’ শিরোনামের এ সমঝোতায় আগামী ১৯ জুন আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। স্বাক্ষরের পর উভয় পক্ষ একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে ৬০ দিনের আলোচনার সুযোগ পাবে। এর আগে সংবাদমাধ্যম সিএনএন যে খসড়া প্রকাশ করেছিল, প্রকাশিত সরকারি নথির সঙ্গে তার উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া গেছে।
চুক্তি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দ্রুত উন্মুক্ত করা হবে এবং ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে উৎপন্ন বর্জ্য অপসারণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। এর বিনিময়ে তেহরান চুক্তির শর্ত মেনে চললে ওয়াশিংটন ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক সুবিধা ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের উদ্যোগ বাড়াবে।
প্রকাশিত ১৪ দফার প্রথম ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের সংশ্লিষ্ট মিত্ররা লেবাননসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সব ধরনের সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করবে। পাশাপাশি একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ধারায় দুই দেশ পরস্পরের স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছে। তৃতীয় ধারায় ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যদিও পারস্পরিক সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যাবে।
চতুর্থ ও পঞ্চম ধারায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক চলাচলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সমঝোতা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে, যা ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে ইরান পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও অবাধ চলাচল নিশ্চিত করবে। সমুদ্রপথে থাকা মাইন ও অন্যান্য বাধা অপসারণের কাজও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা হবে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে ষষ্ঠ ও সপ্তম ধারায় বলা হয়েছে, ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক অংশীদাররা অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের বিষয়টি চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হবে।
পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত অষ্টম ধারায় ইরান পুনরায় জানিয়েছে যে তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। দেশটির মজুত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে এবং ভবিষ্যৎ পারমাণবিক চাহিদা কীভাবে পূরণ হবে, তা আইএইএ’র তত্ত্বাবধানে চূড়ান্ত চুক্তিতে নির্ধারণ করা হবে।
নবম ধারায় বলা হয়েছে, চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকবে। এ সময় ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা অপরিবর্তিত রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করবে না।
দশম ও একাদশ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানি, ব্যাংকিং কার্যক্রম, বীমা এবং পরিবহন খাতে বিশেষ ছাড় দেবে। একই সঙ্গে ইরানের স্থগিত বা জব্দ করা সম্পদ ও তহবিল ধাপে ধাপে মুক্ত করার ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
শেষ তিনটি ধারায় সমঝোতা বাস্তবায়নের জন্য একটি তদারকি কাঠামো গঠনের কথা বলা হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু প্রাথমিক শর্ত বাস্তবায়নের পর বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে হোয়াইট হাউস এই সমঝোতা স্মারককে মূলত একটি রাজনৈতিক দলিল হিসেবে উল্লেখ করে এর গুরুত্ব কিছুটা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের মধ্যকার সব গোপন বোঝাপড়ার পূর্ণ প্রতিফলন নয়।
অন্যদিকে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম আগে ফাঁস হওয়া খসড়ার নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। তবে শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত স্বাক্ষর অনুষ্ঠান সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন