আন্তঃসীমান্ত বিমান হামলা, ড্রোন আক্রমণ ও পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে সংকটপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এটিকে ইতোমধ্যেই একটি সক্রিয় প্রচলিত সংঘাত হিসেবে দেখছেন। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই উত্তেজনা কি শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে?
আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে কয়েক মাস ধরে চলমান সহিংসতা সম্প্রতি আরও তীব্র হয়েছে। পাকিস্তান জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আফগানিস্তান থেকে বেলুচিস্তান প্রদেশে প্রবেশ করা চারটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের দাবি, সারানান এলাকায় একটি সরকারি স্কুলের কাছে ড্রোন বিস্ফোরণে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, আফগান তালেবান সরকার দাবি করেছে, তারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা চালিয়ে বেলুচিস্তানের সারানানে একটি আইএসআইএস ঘাঁটি এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ার কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। যদিও আফগানিস্তানের প্রচলিত যুদ্ধবিমান নেই, তবে তাদের কাছে কয়েকটি বিমান, হেলিকপ্টার এবং ড্রোন রয়েছে, যা সীমান্ত সংঘর্ষে ক্রমেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার অন্যতম কারণ ২৭ জুন করাচিতে সিন্ধু রেঞ্জার্স সদর দপ্তরে জঙ্গি হামলা। বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণের ওই হামলায় পাকিস্তানের আধাসামরিক বাহিনীর তিন সদস্য নিহত এবং চারজন আহত হন।
ইসলামাবাদ এ হামলার জন্য তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সহযোগী সংগঠন জামাত-উল-আহরারকে দায়ী করে এবং অভিযোগ তোলে, হামলাকারীরা আফগান সীমান্ত ব্যবহার করেছে।
এর জবাবে পাকিস্তান আফগানিস্তানের পাক্তিয়া, পাক্তিকা ও কুনার প্রদেশে সমন্বিত স্থল ও বিমান অভিযান চালায়। পাকিস্তানের দাবি, এসব হামলায় অন্তত ২৫ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে এবং বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি বাজৌর জেলায় পরিচালিত অভিযানে জামাত-উল-আহরারের চার সদস্য নিহত হন। টিটিপিও নিশ্চিত করেছে যে, তাদের একজন কমান্ডার খান ফিরোশ ওরফে জাবুল ওই অভিযানে নিহত হয়েছেন।
পাকিস্তান এসব অভিযানকে সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করলেও আফগান তালেবান অভিযোগ করেছে, হামলায় ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
আফগানিস্তানে জাতিসংঘ সহায়তা মিশনের (ইউএনএএমএ) তথ্যমতে, পাকিস্তানের বিমান হামলায় অন্তত ২৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৪৯ জন আহত হয়েছেন। তবে আফগান সরকারের দাবি আরও বেশি—তাদের মতে, ৩৮ জন নিহত এবং ১৬৩ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।
আফগান কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পাক্তিয়া প্রদেশের একটি আবাসিক এলাকায় প্রথম দফার বোমা হামলার পর উদ্ধারকাজ চলাকালে দ্বিতীয়বার হামলা চালানো হয়। দেশটির উপ-তথ্যমন্ত্রী মোহাজের ফারাহি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘উপযুক্ত সময়ে এই হামলার প্রতিশোধ নেওয়া হবে।’
কীভাবে সংঘাত এত দূর গড়াল?
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্কে অবনতির মূল কারণ টিটিপিকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিরোধ। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগান তালেবান টিটিপি জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। তবে কাবুল বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংকট সম্পূর্ণ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
গত বছরের অক্টোবর থেকে সীমান্ত সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে। পাকিস্তান প্রথমবারের মতো কাবুল পর্যন্ত বিমান হামলা চালায়। কাতারের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে পাকিস্তান 'অপারেশন গজব লিল হক' নামে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করে।
এর জবাবে তালেবান সীমান্ত পেরিয়ে পাল্টা হামলা চালায় এবং পাকিস্তানের ২৭টি সীমান্ত চৌকি দখলের দাবি করে। মার্চে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে কাবুল, কান্দাহার, বাগরাম, রাওয়ালপিন্ডি, কোয়েটাসহ বিভিন্ন এলাকায় সামরিক হামলা ও ড্রোন অভিযানে রূপ নেয়।
সংঘাতের মূল কারণ হিসেবে বর্তমান সংকটের পেছনে রয়েছে তিনটি প্রধান কারণ— ১) টিটিপিকে ঘিরে পাকিস্তানের নিরাপত্তা উদ্বেগ। ২) আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ। ৩) ১৮৯৩ সালে নির্ধারিত ডুরান্ড লাইন সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধ।
পাকিস্তান ডুরান্ড লাইনকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও আফগানিস্তান তা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয়নি। সীমান্তে পাকিস্তানের বেড়া নির্মাণও বহুবার সশস্ত্র সংঘর্ষের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে সংঘাত থামাতে অতীতে কাতার ও চীন মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর রাশিয়াও উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সম্ভাবনা কতটা?
উত্তেজনা দ্রুত বাড়লেও অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রচলিত যুদ্ধের সম্ভাবনা এখনো সীমিত।
পাকিস্তান বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতির মুখোমুখি। ফলে আফগানিস্তানে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান পরিচালনা করা তাদের জন্য ব্যয়বহুল হবে। অন্যদিকে, তালেবানের কাছে সীমিতসংখ্যক বিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী প্রচলিত যুদ্ধ পরিচালনার মতো ভারী সামরিক সক্ষমতা নেই।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, সংঘাত এখন আর শুধু সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। কাবুল, কান্দাহার, করাচি, কোয়েটা, রাওয়ালপিন্ডি এবং বেলুচিস্তানের মতো দূরবর্তী এলাকাও সামরিক অভিযানের আওতায় চলে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যতদিন পাকিস্তান টিটিপিকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করবে এবং আফগান তালেবান তা অস্বীকার করবে, ততদিন এই সংঘাতের মূল কারণগুলো অমীমাংসিতই থেকে যাবে। ফলে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সম্ভাবনা আপাতত কম হলেও সীমান্তজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা ও সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন