ভারতের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম—স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক তুঙ্গে। একদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, অন্যদিকে প্রশাসনিক চাপের শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন সরকারি কর্মচারীরা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ৯ জন আত্মহত্যা করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও প্রশাসনিক ভয়ভীতির কারণেই এসব মৃত্যু ঘটেছে।
উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌয়ের সারাভা গ্রামের বাসিন্দা বিজয় কুমার ভার্মা (৫০) ছিলেন একজন চুক্তিভিত্তিক সরকারি শিক্ষক। ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে তাকে বিএলও হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
গত ১৪ নভেম্বর গভীর রাতে বাড়িতে কাজ করার সময় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায়, তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। টানা ১০ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়।
বিজয়ের ছেলে হর্ষিত ভার্মা জানান, তার বাবা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতেন। মোবাইল ফোনে সারাক্ষণ কর্মকর্তাদের ফোন ও বার্তা আসত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে শাস্তির হুমকিও দেওয়া হতো।
পরিবারের অভিযোগ, মৃত্যুর পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেবল আনুষ্ঠানিক সমবেদনা জানানো হয়েছে, কোনো আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়নি।
দিনে মাঠে, রাতে অনলাইনে কাজ
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লক্ষ্ণৌয়ের কয়েকজন বিএলও জানান—
১. দিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ
২. রাতে অনলাইনে ফর্ম আপলোড
৩. দিনে গড়ে মাত্র ২ ঘণ্টা ঘুম
৪. অনেক সময় টানা কয়েক দিন ঘুমহীন অবস্থায় কাজ
৫. সার্ভার ডাউন থাকায় ভোর ৪টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে
একজন নারী বিএলও বলেন, গ্রামের অনেক মানুষের ডিজিটাল কাগজপত্র নেই। আলমারি বা ট্রাংক ঘেঁটে কাগজ বের করতে হয়, এতে সময় ও মানসিক চাপ দুটোই বেড়ে যায়।
বিএলওদের অভিযোগ—
১. মাত্র ২-৩ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং দেওয়া হয়েছে
২. কোনো প্রযুক্তিগত সহায়তা বা ডেটা এন্ট্রি অপারেটর দেওয়া হয়নি
৩. সামান্য ভুল হলে পুরো কাজ নতুন করে করতে হয়েছে
বিভিন্ন রাজ্যে মৃত্যুর খবর
আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—
বিহার: অন্তত ২ জন বিএলওর মৃত্যু
পশ্চিমবঙ্গ: ৪ জনের মৃত্যু, একজন শিক্ষিকার আত্মহত্যা
রাজস্থান: ৪৪ বছর বয়সি শিক্ষক অনুজ গর্গের হৃদরোগে মৃত্যু
উত্তর প্রদেশ: বিএলও সারভেশ সিং আত্মহত্যা করেন
সারভেশ সিং মৃত্যুর আগে একটি ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘দিন-রাত কাজ করেও লক্ষ্য পূরণ করতে পারিনি। আমি ব্যর্থ হয়েছি।’
এই বিশেষ কর্মসূচি নিয়ে বিরোধী দলগুলো শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলছে। অভিযোগ রয়েছে— বিহারে প্রায় ৪৭ লাখ এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৫৮ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী একে আখ্যা দিয়েছেন, গণতন্ত্র ধ্বংসের জন্য নির্বাচন কমিশনের ভয়ংকর পরিকল্পনা। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এদিকে, নির্বাচন কমিশন সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, বিএলওদের কাজ স্বাভাবিক। অতিরিক্ত চাপ নেই।
সূত্র : আল জাজিরা



