ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এখন কেবল কূটনৈতিক বাকযুদ্ধে সীমাবদ্ধ নেই। হামলা- পাল্টা হামলার প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি রূপ নিচ্ছে সম্ভাব্য আকাশযুদ্ধে। এই যুদ্ধশঙ্কা ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে—বিশেষ করে বিমান পরিবহন ও পর্যটন খাতে।
ইরানের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল নৌবহর অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সংঘাতের আশঙ্কায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে বিমান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।
বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন বিমানসংস্থা রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইন্স অনির্দিষ্টকালের জন্য দুবাই, রিয়াদ, দাম্মাম এবং তেলআবিবে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে যে, নিরাপত্তার খাতিরে তাদের বিমানগুলো এখন ইরান, ইরাক ও ইসরায়েলসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশের আকাশসীমা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলছে। একই ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করে ইউনাইটেড এয়ারওয়েস এবং এয়ার কানাডাও।
একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ফ্লাইট বাতিল করায় আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিমান চলাচল বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ আকাশপথ বন্ধ বা সীমিত হলে বিশ্বব্যাপী বিমান সংস্থাগুলোর দৈনিক ক্ষতি প্রায় ৮–১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এক সপ্তাহের মধ্যে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার।
একটি দীর্ঘপথের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট থেকে গড়ে ২.৫ থেকে ৩ লাখ ডলার আয় হয়। প্রতিদিন যদি ৫০–৬০টি ফ্লাইট বাতিল হয়, তবে শুধুমাত্র টিকিট আয়ের ক্ষতিই হয় ১৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় যাত্রীদের রিফান্ড, বিকল্প ফ্লাইট ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ। বিকল্প রুট ব্যবহারের ফলে জ্বালানি ব্যয় প্রায় ১৫–২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও গভীর। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও জর্ডানের মতো দেশগুলোতে পর্যটন খাতে বুকিং প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, যার ফলে এক মাসেই প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও গ্রাউন্ড সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও ল্যান্ডিং ফি ও কার্গো সেবায় কোটি কোটি ডলার হারাচ্ছে।
এছাড়া আকাশপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার খরচ প্রায় ১০–১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৫–১০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যায়, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্লাইট বাতিল শুধু পরিবহন সংকট নয়, বরং এটি একটি বহু-বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ধাক্কা, যা দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।



