পাকিস্তানের অশান্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানকে ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভাইরাল চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, বেলুচ স্বাধীনতাকামী নেতারা পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র বেলুচিস্তান’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন এবং জাতিসংঘের কাছে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা, নতুন সরকার গঠন কিংবা বেলুচিস্তানের বড় অংশ কোনো স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ভাইরাল হওয়া ওই নথিতে বেলুচ জাতীয়তাবাদী নেতারা দাবি করেছেন, কয়েক দশকের বৈষম্য, জোরপূর্বক গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থানীয় জনগণের অধিকার না থাকার কারণেই স্বাধীনতার দাবি জোরালো হয়েছে।
বেলুচ কর্মী ও লেখক মীর ইয়ার বেলুচের নামে প্রচারিত এক বার্তায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘকে ‘গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র বেলুচিস্তান’-কে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইতিহাসের শিকড় বেলুচ স্বাধীনতা আন্দোলন
বেলুচ স্বাধীনতাবাদী আন্দোলনের শিকড় ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের দাবি, ব্রিটিশ ভারতের সময় কালাতের রাজ্য স্বল্প সময়ের জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান অঞ্চলটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়, যা বেলুচ জাতীয়তাবাদীরা মেনে নেয়নি।
তাদের অভিযোগ, বেলুচিস্তানের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ—বিশেষ করে গ্যাস, খনিজ ও অন্যান্য সম্পদ—কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবহার করলেও স্থানীয় জনগণ উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আয়তনের দিক থেকে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। দেশটির প্রায় ৪৪ শতাংশ ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলটি তামা, সোনা, গ্যাস, কয়লা ও বিভিন্ন খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও পাকিস্তানের অন্যতম দরিদ্র ও অনুন্নত এলাকা হিসেবে পরিচিত।
সহিংসতা বেড়েছে
সাম্প্রতিক সময়ে বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। জুলাই মাসের শুরুতে একাধিক হামলায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের ব্যবধানে হামলায় বহু মানুষ নিহত হন। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের দাবি, এসব হামলার পেছনে সক্রিয় রয়েছে বেলুচ সশস্ত্র সংগঠনগুলো।
জিয়ারাত অঞ্চলের মাঙ্গি বাঁধ এলাকায় একটি পুলিশ পোস্টে হামলার পর কয়েকজন পুলিশ সদস্য অপহৃত হন। পরে তাদের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়। একই সময়ে পৃথক হামলায় সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এর পর পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, ফ্রন্টিয়ার কোর ও পুলিশ যৌথভাবে ব্যাপক অভিযান শুরু করে।
পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমদ শরিফ চৌধুরী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সতর্ক করে বলেন, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএলএ’র তৎপরতা ও নতুন কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানের সশস্ত্র বিদ্রোহ নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-সহ কয়েকটি গোষ্ঠী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের হামলার কৌশল পরিবর্তন করেছে।
আগে যেখানে হামলা সীমিত এলাকায় ছিল, বর্তমানে তারা সামরিক স্থাপনা, পুলিশ পোস্ট, মহাসড়ক, রেললাইন, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং চীনা প্রকল্পগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
তবে বিএলএ বেলুচিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে বা কোনো কার্যকর প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে—এমন তথ্য এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো দাবিতে বলা হয়েছে, প্রদেশের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু এসব দাবির স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
চীনের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ বেলুচিস্তান?
বেলুচিস্তানের কৌশলগত গুরুত্বের অন্যতম কারণ হলো চীনের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্প।
প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের গোয়াদর বন্দরকে ব্যবহার করে আরব সাগরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে চায়।
গোয়াদর বন্দর সিপিইসির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীনের লক্ষ্য, এই বন্দর ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপের বাজারে বাণিজ্যিক যোগাযোগ সহজ করা এবং মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানো।
তবে বেলুচ সশস্ত্র সংগঠনগুলো চীনের এই উপস্থিতির বিরোধিতা করে আসছে। তাদের অভিযোগ, চীনা প্রকল্পগুলো স্থানীয় জনগণের উন্নয়নের পরিবর্তে সম্পদ ব্যবহারের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফলে চীনা নাগরিক ও প্রকল্পগুলো একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো স্বাধীনতা আন্দোলনের সফলতার জন্য শুধু অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম যথেষ্ট নয়; আন্তর্জাতিক সমর্থন ও কূটনৈতিক স্বীকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্বের বিভিন্ন স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া অনেক আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী সংকটে আটকে গেছে।
বেলুচ আন্দোলনের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন সামনে এসেছে—তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করতে পারবে কি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কার্যকর রাজনৈতিক কাঠামো, ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব এবং জনগণের ব্যাপক সমর্থন ছাড়া স্বাধীনতার দাবি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া কঠিন।
ভাইরাল দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন
‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ নামে ছড়িয়ে পড়া চিঠি নতুন করে বেলুচিস্তান ইস্যুকে আলোচনায় আনলেও, বর্তমানে এটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাস্তব ঘটনা হিসেবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
বেলুচিস্তানে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা ও নিরাপত্তা সংকট বাস্তব হলেও, ভাইরাল হওয়া স্বাধীনতার ঘোষণার দাবিটি আপাতত যাচাই-অযোগ্য এবং অনেক বিশ্লেষকের মতে এটি প্রচারণামূলক বার্তাও হতে পারে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বেলুচিস্তানের সংঘাত শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, চীনের বিনিয়োগ এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

