ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের রয়েছে বহুমুখী সেবায় সমৃদ্ধ ভিসা, মাস্টার কার্ড ও ইউনিয়ন পে কার্ড। ব্যাংকটির কার্ড সেবা এবং সার্বিক ডিজিটাল লেনদেনের ইকোসিস্টেম নিয়ে রূপালী বাংলাদেশের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক খান।
এবারের রমজান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কার্ডভিত্তিক কেনাকাটার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জন্য আপনাদের বিশেষ অফারগুলো কী কী?
ইসলামী ব্যাংক রমজান ও ঈদ উপলক্ষে কার্ড গ্রাহকদের জন্য বিভিন্ন আকর্ষণীয় সুবিধা নিয়ে এসেছে, যা উৎসবের কেনাকাটা ও উদযাপনে বিশেষ স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করছে। বড় অঙ্কের কেনাকাটার আর্থিক চাপ কমাতে ইসলামী ব্যাংক দিচ্ছে ‘EZZY BUY’ সুবিধার মাধ্যমে ইলেকট্রনিকস, আসবাবপত্র, মোবাইল ও ল্যাপটপের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যসহ ২,০০০টির বেশি ব্র্যান্ড আউটলেটে আকর্ষণীয় ছাড়ে কেনাকাটা সুবিধা। এ ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আকর্ষণীয় ক্যাশব্যাকসহ ৩৬ মাস পর্যন্ত ২৫০টির বেশি ব্র্যান্ড মার্চেন্টে শূন্য শতাংশ ইএমআই ফ্যাসিলিটিসহ বাই ওয়ান- গেট ওয়ান/টু/থ্রি ফ্রি সুবিধা। পাশাপাশি কার্ডের শ্রেণিভেদে আমাদের গ্রাহকগণ দেশে-বিদেশে ১ হাজার ৫০০-এর অধিক এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ সুবিধা। মাস্টার ব্র্যান্ডের খিদমাহ ক্রেডিট কার্ড ও প্রিপেইড কার্ড হোল্ডারগণ পাচ্ছেন কাপল ট্রিপ টু মালয়েশিয়াসহ স্মার্ট ফোন, মাইক্রো ওভেন, ইলেকট্রনিক ও গ্রোসারি ভাউচার জেতার সুযোগ ।
গ্রাহকদের জন্য আপনারা কত ধরনের ক্রেডিট কার্ড বাজারে এনেছেন?
ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকদের আর্থিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের খিদমাহ ক্রেডিট কার্ড চালু রয়েছে । কার্ডের মধ্যে রয়েছে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় মাস্টারকার্ড এবং ভিসা ব্র্যান্ডের গোল্ড, প্লাটিনাম, প্রায়োরিটি প্লাটিনাম ও মাস্টারকার্ড ওয়ার্ল্ড, যা ব্যবহার করে আমাদের গ্রাহক দেশ ও বিদেশে নগদ উত্তোলন, কেনাকাটাসহ বিভিন্ন প্রকারের সেবা গ্রহণ করছেন। গ্রাহকদের চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে আমরা বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় ক্রেডিট কার্ড সেবা গ্রাহককে প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।
কোন কোন বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে আপনাদের কার্ড অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কার্ডের তুলনায় স্বতন্ত্র বলে মনে করেন?
গ্রাহকের চাহিদার কথা মাথায় রেখে আমরা খিদামহ ক্রেডিট কার্ডে বিভিন্ন সুবিধা দিচ্ছি। ইসলামী ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড শরিয়াসম্মত উজরা নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত একটি সেবা বা প্রোডাক্ট। এর মধ্যে বেশ কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা বাজারে অন্যদের থেকে আলাদা। আমাদের কার্ড গ্রাহক ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধে কোনো প্রকার চার্জ বা বাড়তি ফি ছাড়া সর্বোচ্চ ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া মাত্র ১৮টি লেনদেন করলেই আমারা গ্রাহককে বার্ষিক ফি মওকুফের সুবিধা দিচ্ছি, যা তাদের কাছে আমাদের ক্রেডিট কার্ডগুলোকে আরও সাশ্রয়ী করে তুলেছে।
সর্বনিম্ন ফিতে সেলফিন অ্যাপের মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ড থেকে যেকোনো অ্যাকাউন্টে ফান্ড ট্রান্সফার করা যায় নিমেষেই। কার্ডের স্ট্যাটাসভেদে আমাদের গ্রাহকগণ দেশে-বিদেশে ১ হাজার ৫০০-এর অধিক এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ সুবিধা উপভোগ করতে পারেন। এ ছাড়া ২,০০০টির বেশি ব্র্যান্ড আউটলেটে আকর্ষণীয় ছাড়ে কেনাকাটা সুবিধা। এ ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আকর্ষণীয় ক্যাশব্যাক ৩৬ মাস পর্যন্ত ২৫০টির বেশি ব্র্যান্ড মার্চেন্টে শূন্য শতাংশ ইএমআই সুবিধা।
দেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের কোন কোন বিষয় কার্ডভিত্তিক পেমেন্টব্যবস্থা সম্প্রসারণের পথে অন্তরায় বলে মনে করেন?
বাংলাদেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম দ্রুত এগোলেও কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এদের মধ্যে উচ্চ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (MDR) অন্যতম। ছোট ও মাঝারি দোকানদাররা কার্ডে পেমেন্ট নিতে খুব একটা আগ্রহী হন না, কারণ প্রতিটি লেনদেনে তাদের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ (সাধারণত ১% থেকে ২.৫%) চার্জ দিতে হয়। এ ছাড়া পিওএস (POS) টার্মিনাল বা কার্ড সোয়াইপ মেশিনের দাম এবং এটি রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কিছুটা বেশি। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবে কার্ড পেমেন্টব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়। সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে ভীতি এবং ডিজিটাল স্বাক্ষরতার অভাব কার্ডভিত্তিক লেনদেন সম্প্রসারণে একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক বাধা। আমাদের দেশে ছোট লেনদেনের ক্ষেত্রে যেমন চায়ের দোকান বা মুদি দোকান এসব জায়গায় কার্ডের মাধ্যমে ৫-১০ টাকা পেমেন্ট করার পরিকাঠামো বা মানসিকতা এখনো তৈরি হয়নি। এ ছাড়া কার্ড টু ক্যাশ সেটেলমেন্ট প্রক্রিয়া সহজ না হওয়া একটি অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে ।
বাংলাদেশে জনসাধারণের মধ্যে কেনাকাটায় কার্ড ব্যবহারকে আরও জনপ্রিয় করতে আপনাদের উদ্যোগগুলো কী কী?
বাংলাদেশে কেনাকাটায় কার্ডের ব্যবহারকে আরও জনপ্রিয় এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আমাদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু আধুনিক ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের ৪০০টি শাখা ও ২৭৬টি উপশাখা ও প্রায় ২৮০০ এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে সারা দেশে মানুষের চাহিদার আলোকে খিদমাহ কার্ডের গ্রাহকসংখ্যা বৃদ্ধি করতে নিয়মিত ক্যাম্পেইন, প্রচার-প্রসার চালিয়ে যাচ্ছি। নগদ টাকা বা কার্ড সাথে রাখার ঝামেলা এড়াতে আমরা ‘সেলফিন’ (Cellfin) অ্যাপের মাধ্যমে কিউআর কোড স্ক্যান করে পেমেন্ট করার সুবিধা দিয়েছি। এ ছাড়া আমাদের আধুনিক কার্ডগুলোতে NFC (Near Field Connunication ) বা কন্টাক্টলেস প্রযুক্তি রয়েছে, যেখানে কার্ড মেশিনে পাঞ্চ ও পিন ব্যবহার না করে শুধু স্পর্শ করেই দ্রুত পেমেন্ট করা সম্ভব। বড় অঙ্কের কেনাকাটা (যেমন ল্যাপটপ, মোবাইল বা ফ্রিজ) সহজ করতে আমরা শুন্য শতাংশ প্রফিট রেটে ৩ থেকে ৩৬ মাস পর্যন্ত কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের (ইএমআই ) সুবিধা দিচ্ছি। এটি মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের জন্য কার্ড ব্যবহারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। উৎসবের সময় যেমনÑঈদ বা পহেলা বৈশাখে আমাদের কার্ডহোল্ডাররা বিশেষ ডিসকাউন্ট ও ক্যাশব্যাক সুবিধা পান, যা গ্রাহকদের কার্ড ব্যবহারকারীদের নানাভাবে উৎসাহিত করছে। এ ছাড়া আমরা দেশব্যাপী সহজলভ্যে বাংলা কিউআর ও পওএস মেশিন সরবরাহ করে ক্যাশলেস সমাজ করতে অব্যাহত চেষ্টা করে যাচ্ছি।
ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধিতে সরকার কী ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে?
ডিজিটাল লেনদেন একটি দেশের অর্থনীতিকে স্বচ্ছ ও গতিশীল করে। সরকার ডিজিটাল লেনদেনকে সহজ করতে বাস্তবসম্মত বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এর মধ্যে অন্যতম ২০৩১ সালের মধ্যে ১০০% ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়া। পাশাপাশি বাংলাদেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমকে আরও শক্তিশালী ও জনপ্রিয় করতে আরও কিছু পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারে যেমন ডিজিটাল লেনদেনের ওপর আরোপিত চার্জ কমিয়ে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। কার্ড বা কিউআর কোডে পেমেন্ট করলে নির্দিষ্ট শতাংশ (যেমন ১-২%) সরাসরি ক্যাশব্যাক বা সরকারি ভুর্তকি প্রদান। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের (SME) জন্য কার্ড বা ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ সহজ করতে এমডিআর চার্জ সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে কমিয়ে আনা। যাতে দোকানদাররা ক্যাশ টাকার চেয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট নিতে বেশি আগ্রহী হয়। শহরের বাইরেও নিরবচ্ছিন্ন ৪জি/৫জি ইন্টারনেট নিশ্চিত করা এবং দুর্গম এলাকায় 'ক্যাশলেস' বাজার গড়ে তোলা। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল, হোল্ডিং ট্যাক্স, পাসপোর্টের ফি এবং লাইসেন্স ফিসহ সব সরকারি ফি শুধু ডিজিটাল মাধ্যমে পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা। এতে মানুষ বাধ্য হয়েই ডিজিটাল পেমেন্টে অভ্যস্ত হবে।

