× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: মে ৪, ২০২৬, ০৫:৫১ এএম

প্রকৃতির ঘাতক বজ্রপাত

হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: মে ৪, ২০২৬, ০৫:৫১ এএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম প্রতাপপুর। গত ২৬ এপ্রিল সকালে যখন আকাশ কালো করে মেঘ জমছিল, কৃষক রহমত আলী (৪৫) তখন ব্যস্ত ছিলেন নিজের শেষ সম্বল খেতের বোরো ধান ঘরে তুলতে। বাড়ির উঠানে স্ত্রী সালেহা বেগম অপেক্ষা করছিলেন দুপুরের খাবারের জন্য। কিন্তু রহমত আলী আর ফেরেননি। এক ঝলক তীব্র আলোর সঙ্গে প্রচ- শব্দে যখন চারপাশ কেঁপে উঠে, রহমত আলী তখন মাঠেই লুটিয়ে পড়েন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে এখন দিশাহারা সালেহা আর তার তিন সন্তান।

এভাবে গত এপ্রিলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বজ্রপাতে অন্তত ৫০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। বিশেষ করে গত ২৬ এপ্রিল এক দিনেই ১৪ জন কৃষকের অকাল মৃত্যু হয়। বজ্রপাত এখন কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য এক নতুন ‘মহামারি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাত এখন এক আতঙ্কের নাম।

সাধারণত বজ্রপাত হলো বায়ুমণ্ডলে থাকা মেঘের ভেতরে পুঞ্জীভূত স্থির বিদ্যুতের একটি বিশাল ও শক্তিশালী নিঃসরণ।

বজ্রপাত সৃষ্টির প্রক্রিয়া : বজ্রপাত হলো বায়ুমণ্ডলের পুঞ্জীভূত স্থির বিদ্যুতের এক বিশাল ও শক্তিশালী নিঃসরণ। সহজ কথায় বললে, তীব্র গরমে হালকা বাতাস প্রচুর জলীয় বাষ্প নিয়ে উপরে উঠে যখন বিশাল মেঘ তৈরি করে, তখন মেঘের ভেতরের কণাগুলোর ঘর্ষণে তৈরি হওয়া বিদ্যুৎ শক্তিই আলোর ঝলকানি হয়ে মাটিতে নেমে আসে।

বজ্রপাতে বাংলাদেশের অবস্থান : আন্তর্জাতিক গবেষণা ও উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এশিয়ায় বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘনত্বের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন শীর্ষ অবস্থানে। যদিও আয়তনের কারণে ভারত ও চীনে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেশি, কিন্তু প্রতি বর্গকিলোমিটারে বজ্রপাতে কতজন মানুষ মারা যান- সেই হিসাবে বাংলাদেশ এশিয়ায় প্রথম। নাসার এক গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যোদয় থেকে দুপুর পর্যন্ত সময়ে বজ্রপাতের ঘটনার হার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। এই সময়েই দেশের লাখ লাখ কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ খোলা মাঠে বোরো ধান কাটা বা মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত থাকেন। এই সময়টিই বজ্রপাত সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

বজ্রপাতের ‘পিক সিজন’ ও ঝুঁকিপূর্ণ সময় : আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘থিওরেটিক্যাল অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড ক্লাইমাটোলজি’তে প্রকাশিত গবেষণায় বাংলাদেশের বজ্রপাতের সময়কাল ও প্রকৃতি নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

৯৩ শতাংশ বজ্রপাত হয় ৪ মাসে। অধ্যাপক ড. আশরাফ দেওয়ানের নেতৃত্বাধীন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরের মোট বজ্রপাতের প্রায় ৯৩ শতাংশই ঘটে মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে। গবেষকরা একে বজ্রপাতের ‘পিক সিজন’ বা প্রধান মৌসুম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মাস : তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, মে মাসে বজ্রপাতের তীব্রতা থাকে সর্বোচ্চ। এই মাসকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর পরেই এপ্রিল ও জুন মাসের অবস্থান।

দিনের বিপজ্জনক সময় : গবেষণায় দিনের ২৪ ঘণ্টার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময়টি সবচেয়ে বিপজ্জনক। এই সময়ে সূর্যের তাপে বায়ুম-লে আর্দ্রতা ও অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ায় ‘বজ্রগর্ভ মেঘ’ দ্রুত তৈরি হয়।

ভৌগোলিক হটস্পট : উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকরা দেখেছেন, হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জ, সিলেট, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলা বজ্রপাতের প্রধান ‘হটস্পট’। মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ হওয়ায় এই অঞ্চলে বজ্রপাতের ঘনত্ব দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় অনেক বেশি।

বজ্রপাত বেশি হওয়ার কারণ : অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আশরাফ দেওয়ানের নেতৃত্বে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় বজ্রপাতের মরণঘাতী প্রভাব বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় ভয়াবহ।

ভৌগোলিক কারণ : বাংলাদেশের উত্তরে বিশাল হিমালয় পর্বতমালা এবং দক্ষিণে বিশাল বঙ্গোপসাগর। হিমালয় থেকে আসা শীতল বাতাস এবং সাগর থেকে আসা উষ্ণ-আর্দ্র বাতাসের মিলনস্থল ঠিক বাংলাদেশের আকাশ। এই দুই বিপরীতধর্মী বাতাসের সংঘাতের ফলে এখানে ‘মেসোস্কেল কনভেক্টিভ সিস্টেম’ তৈরি হয়, যা ভয়াবহ বজ্রপাত ঘটায়।

তাপমাত্রা বৃদ্ধি : বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (বিএমডি) গত ৫০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে গড় বার্ষিক তাপমাত্রা প্রায় ০.৫ থেকে ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। বায়ুম-ল যত উত্তপ্ত হয়, এটি তত বেশি জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে, যা মেঘের বিদ্যুতায়নের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

উঁচু গাছের সংকট : আগে গ্রামবাংলায় তালগাছ, সুপারি গাছ বা বটগাছ ছিল প্রচুর। এই গাছগুলো প্রাকৃতিকভাবে ‘আর্থিং’ হিসেবে কাজ করত। বজ্রপাত হলে তা সরাসরি ওই উঁচু গাছ দিয়ে মাটিতে চলে যেত। বর্তমানে বন উজাড় এবং গাছ কাটার ফলে খোলা মাঠে থাকা মানুষই এখন সবচেয়ে উঁচু বিন্দু হিসেবে কাজ করে।

হাওরাঞ্চলের বিশেষত্ব : সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের বিশাল হাওর এলাকায় কোনো উঁচু কাঠামো না থাকায় বজ্রপাত সরাসরি সমতল ভূমিতে আঘাত হানে, যেখানে কৃষকরা কাজ করেন।

যেসব এলাকায় বজ্রপাত বেশি হয় : ড. আশরাফ দেওয়ান ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের যৌথ গবেষণা সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে ‘বজ্রপাত হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সুনামগঞ্জ জেলায়। এখানে নিহতদের ৭০ শতাংশই কৃষক এবং মৃত্যুর হার পুরুষদের মধ্যে বেশি ৮৫ শতাংশ। গবেষকরা দেখেছেন, কৃষকরা যখন বোরো ধান কাটতে মাঠে থাকেন, ঠিক সেই সময়েই বজ্রপাত সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছায়। এরপরই রয়েছে সিলেট। এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ হলো উত্তরের মেঘালয় পাহাড়ের অবস্থান। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ উষ্ণ বাতাস যখন পাহাড়ের গায়ে বাধা পায়, তখন সেখানে দ্রুত বজ্রমেঘ তৈরি হয়, যা এই অঞ্চলে প্রবল বজ্রপাত ঘটায়।

হাওর অঞ্চল : সুনামগঞ্জ ও সিলেটের পর বজ্রপাতের সবচেয়ে বেশি প্রবণতা দেখা যায় নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলায়। বিশাল উন্মুক্ত জলাভূমি বা হাওর এলাকা হওয়ায় এখানে মেঘ তৈরির জন্য পর্যাপ্ত জলীয় বাষ্প পাওয়া যায়। গবেষণার তথ্যানুযায়ী, এই চারটি জেলা (সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ) দেশের প্রধান বজ্রপাত প্রবণ অঞ্চল।

উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল : বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলাও বজ্রপাতের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষকদের মতে, এই অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয়ভাবে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হয়। ফলে এখানে প্রায়ই বজ্রপাতে প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়।

এ ছাড়া ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর এবং সাতক্ষীরা অঞ্চলেও বজ্রপাতের ঘনত্ব বেশি দেখা যায়।

বজ্রপাত যখন আঘাত হানে, তখন সেখানে প্রধানত তিনটি ঘটনা ঘটে। সেগুলো হলোÑ অকল্পনীয় তাপ ও আলো : একটি গড়পড়তা বজ্রপাতে প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উৎপন্ন হয়, যা সূর্যের উপরিভাগের চেয়েও ৫ গুণ বেশি। এর আলো এতই তীব্র যে সরাসরি তাকালে দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ : মানুষের শরীরে সরাসরি বজ্রপাত হলে হৃৎপিণ্ড এবং মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেত ব্যবস্থা মুহূর্তেই অকেজো হয়ে যায়। এতে হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটে।

অনেকে মনে করেন, গাছের নিচে আশ্রয় নিলে বাঁচা যাবে, কিন্তু বজ্রপাত যখন গাছে পড়ে, তখন তা পাশে থাকা মানুষের শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে। একে ‘সাইড ফ্ল্যাশ’ বলা হয়।

শব্দ তরঙ্গ : তীব্র তাপে আশপাশের বাতাস হঠাৎ প্রসারিত হওয়ায় প্রচণ্ড শব্দের সৃষ্টি হয়। এতে কানের পর্দা ফেটে যেতে পারে বা স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে।

গবেষক ড. আশরাফ দেওয়ান বলেন, বজ্রপাত এখন বাংলাদেশের জন্য একটি নীরব ঘাতক। সরকার ২০১৬ সালে এটিকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ে এর সমাধান এখনো অনেক দূরে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও হাওর অঞ্চলের কৃষকদের জন্য আমাদের একটি সমন্বিত সুরক্ষা পরিকল্পনা দরকার। শুধু গাছ লাগানোই সমাধান নয়, কারণ তালগাছ বড় হতে দীর্ঘ সময় লাগে। আমাদের এখন প্রযুক্তিগত সমাধানে যেতে হবে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বায়ুম-লের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে বাংলাদেশে বজ্রপাতের তীব্রতা ও সংখ্যা- উভয়ই বাড়ছে। বিশেষ করে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে (মার্চ-মে) যখন বঙ্গোপসাগর থেকে আসা প্রচুর জলীয় বাষ্প এবং স্থলভাগের প্রচণ্ড তাপের মিলন ঘটে, তখন আকাশে বিশাল আকৃতির ‘কিউমুলোনিম্বাস’ বা বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হয়। এই মেঘ যত শক্তিশালী হয়, বজ্রপাতের আশঙ্কাও তত বেড়ে যায়।

বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষার উপায় : বজ্রপাত থেকে সুরক্ষায় বৈজ্ঞানিক ও টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে বিজ্ঞানী এবং গবেষকরা চার স্তরের একটি সমন্বিত পদক্ষেপের প্রস্তাব করেছেন। তাদের মতে, এই পর্যায়গুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। সেই চারটি স্তর হলো-

কারিগরি ও অবকাঠামোগত সুপারিশ : এই স্তরের মূল লক্ষ্য হলো- আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবন ও স্থাপনাকে সরাসরি বজ্রপাতের আঘাত থেকে রক্ষা করা। প্রতিটি বহুতল ভবন, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর এবং কলকারখানায় মানসম্মত ‘বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড’ বা লাইটিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এ ছাড়া ভবনের ভেতরের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম যেমন টিভি, ফ্রিজ বা কম্পিউটারকে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ থেকে সুরক্ষা দিতে ‘সার্জ প্রোটেক্টিভ ডিভাইস’ ব্যবহার করা উচিত। সঠিক গ্রাউন্ডিং বা আর্থিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে বজ্রপাতের বিদ্যুৎ কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই সরাসরি মাটিতে চলে যেতে পারে।

আর্লি ওয়ার্নিং ও কমিউনিকেশন : বজ্রপাত হওয়ার আগে মানুষকে সতর্ক করার জন্য একটি শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এই স্তরের প্রধান কাজ। আধুনিক ডিটেকশন সেন্সর ব্যবহার করে বজ্রপাত হওয়ার ১৫ থেকে ৩০ মিনিট আগেই সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষকে আগাম বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। মোবাইল অ্যাপ, এসএমএস কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়ের বিশেষ সংকেত ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত এই তথ্য প্রচার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে কৃষক ও জেলেরা যেন খোলা জায়গায় থাকাকালে দ্রুত এই সতর্কবার্তা পেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেন, সেই নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করা জরুরি।

দীর্ঘমেয়াদি প্রাকৃতিক সমাধান : পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর জন্য খোলা মাঠ বা হাওর অঞ্চলের রাস্তার দুই পাশে প্রচুর পরিমাণে তালগাছ বা অন্য কোনো দ্রুত বর্ধনশীল উঁচু গাছ রোপণ করা প্রয়োজন। উঁচু গাছগুলো প্রাকৃতিক বজ্রপাত নিরোধক হিসেবে কাজ করে এবং আকাশের বিদ্যুৎকে সরাসরি নিজের মাধ্যমে মাটিতে পৌঁছে দেয়।

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা : ভৌগোলিক বা কারিগরি সুরক্ষার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতাই জীবন বাঁচানোর জন্য সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। আকাশে ঘন কালো মেঘ দেখা দিলে বা বজ্রপাতের শব্দ শুনলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত কোনো পাকা দালান বা সুরক্ষিত আশ্রয়ে চলে যেতে হবে। বজ্রপাত চলাকালে খোলা মাঠ, জলাশয়, বড় গাছ বা ধাতব বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে অন্তত ১০০ ফুট দূরে থাকা নিরাপদ। খোলা মাঠে থাকলে এবং আশপাশে কোনো আশ্রয় না থাকলে উবু হয়ে বসে পড়ুন। মাথার ওপর ছাতা বা ধাতব বস্তু ধরবেন না। নৌকায় থাকলে ছইয়ের নিচে বা পাটাতনের নিচে আশ্রয় নিন। বজ্রপাতের সময় ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে দূরে থাকুনÑ এগুলো ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বজ্রপাত নিয়ে প্রচলিত মিথ ও বাস্তবতা : বজ্রপাত নিয়ে নানা ধরনের কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে, যা অনেক সময় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, অনেকে মনে করেন মোবাইল ফোন বজ্রপাতকে আকর্ষণ করে; কিন্তু বাস্তবতা হলো মোবাইলের রেডিও তরঙ্গ বজ্রপাতকে টানে না, তবে ধাতব অংশের সংস্পর্শে আঘাতের তীব্রতা বাড়তে পারে। সবচেয়ে মর্মান্তিক ও ভয়ংকর মিথ হলো- বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির হাড় বা শরীরের অংশে অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে এবং তা অত্যন্ত ‘মূল্যবান’। এই অন্ধবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে এক শ্রেণির অসাধু চক্র কবর থেকে মরদেহ চুরির মতো জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হয়, যার কোনো বৈজ্ঞানিক বা বাস্তব ভিত্তি নেই।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!