রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্দেশ্য জনগণের জীবনমান উন্নত করা, দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার। কিন্তু যখন কোনো প্রকল্প পরিকল্পনার ত্রুটি, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন সেই উন্নয়ন জনগণের কাছে আশীর্বাদ নয়, বরং বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। সন্দ্বীপে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ও সাবমেরিন অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ প্রকল্পের বর্তমান চিত্র এমনই এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে।
মাত্র আট বছর আগে যে প্রকল্পকে সন্দ্বীপবাসীর ভাগ্যোন্নয়নের মাইলফলক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, আজ সেটিই নদীভাঙনের মুখে বিপন্ন। যে সাবমেরিন ক্যাবল অন্তত অর্ধশতাব্দী কার্যকর থাকার কথা ছিল, তা অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কি যথাযথ পরিকল্পনা করা হয়েছিল? নদীভাঙনপ্রবণ উপকূলীয় এলাকায় এমন অবকাঠামো নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন কি আদৌ সম্পন্ন হয়েছিল? নাকি উন্নয়নের নামে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যেখানে জনগণের স্বার্থের চেয়ে অন্য কোনো স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে?
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রকৃতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের অজ্ঞ থাকার সুযোগ নেই। নদীভাঙন, স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন, তলদেশের রূপান্তর এবং উপকূল ক্ষয় এখানে নিয়মিত ঘটনা। ফলে এমন এলাকায় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা ছিল অত্যাবশ্যক। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে, পরিকল্পনায় গুরুতর ঘাটতি ছিল অথবা সম্ভাব্য ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার মানুষ। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং, মোবাইল যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একটি দ্বীপাঞ্চল আবারও বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকিতে পড়বে। অর্থাৎ ভুল পরিকল্পনা বা অনিয়মের দায় বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই প্রায়শই দেখা যায়, দায় নির্ধারণের পরিবর্তে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়। তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে তার ফলাফল জনসম্মুখে আসে না, দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে একই ধরনের ভুল ও অনিয়ম বারবার ঘটার সুযোগ তৈরি হয়। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আমরা মনে করি, এ ঘটনায় অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন, ব্যয় নির্ধারণ, বাস্তবায়ন এবং তদারকির প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখতে হবে। কোথায় ভুল হয়েছে, কারা দায়িত্বে ছিলেন এবং কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে কি না, তা স্পষ্টভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। তদন্তে দায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে বর্তমান সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। উন্মুক্ত ক্যাবল রক্ষায় ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা, অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিকল্প বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। ভবিষ্যতের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং কঠোর তদারকিকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
উন্নয়ন কখনো শুধু উদ্বোধনী ফলক, ব্যয়ের অঙ্ক কিংবা রাজনৈতিক প্রচারণার বিষয় হতে পারে না। প্রকৃত উন্নয়ন হলো জনগণের সম্পদ সুরক্ষিত রেখে টেকসই সুবিধা নিশ্চিত করা। সন্দ্বীপের সাবমেরিন ক্যাবল সংকট আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, জবাবদিহিহীন উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন নয়, বরং জাতীয় সম্পদের অপচয়। তাই উন্নয়নের নামে লুটপাট ও দায়হীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে এবং জনগণের অর্থ অপচয়ের জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনতেই হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন