প্রতি বছর জুন মাস এলেই জাতীয় সংসদ ভবনের লাল গালিচা, অর্থমন্ত্রীর ব্রিফকেস আর টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর পর্দাজুড়ে এক উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। খবরের কাগজের প্রথম পাতাগুলো দখল করে নেয় লাখো কোটি টাকার বিশাল সব সংখ্যা। আমরা জানতে পারি, এবারের বাজেট গতবারের চেয়ে কত হাজার কোটি টাকা বড়। কিন্তু এই বিশাল অঙ্কের জাঁকজমকের আড়ালে একটি নীরব প্রশ্ন সব সময়ই রয়ে যায়। এই ট্রিলিয়ন টাকার বাজেট কি সাধারণ মানুষের জীবনে এক ফোঁটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারছে? বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘বাজেটের অঙ্ক বড়, স্বস্তি ছোট’ কথাটি কেবল একটি শিরোনাম নয়, বরং খেটে খাওয়া কোটি মানুষের জীবনের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।
বাজেট বক্তৃতায় আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধির গল্প শুনি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দেখে মুগ্ধ হই। কাগজে-কলমে দেশ এগোচ্ছে, অর্থনীতি বড় হচ্ছে। কিন্তু মেহেরপুরের একজন কৃষক বা ঢাকার মিরপুরের একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের কাছে এই বিশাল সংখ্যার কোনো অর্থ নেই। তাদের কাছে বাজেট মানে হলোÑ কাল সকালে বাজারের ফর্দটা মেলাতে পারব তো? চাল, ডাল, তেল আর কাঁচামরিচের দাম কি আরেকটু বাড়বে? যখন বাজেটের আকার বাড়ে, তখন সাধারণ মানুষের মনে আশা জাগে যে হয়তো এবার তাদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাজেট পাসের পরদিন থেকেই কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে বাসভাড়া সবখানেই এক অদৃশ্য আগুন জ্বলে ওঠে। বিশাল বাজেটের ব্যয় মেটাতে সরকার যখন পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের পরিধি বাড়ায়, তখন তার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসে লাগে ওই হতদরিদ্র মানুষের পিঠেই।
বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম মূল্যস্ফীতি। আয়ের খাতাটা যেখানে স্থবির হয়ে আছে, ব্যয়ের খাতাটা সেখানে প্রতিদিন লম্বা হচ্ছে। মাছ-মাংস তো এখন নি¤œবিত্তের জন্য বিলাসী পণ্য, পাতে এক টুকরো ডিম বা একটু ভালো সবজি জুটতেও যেন হিমশিম খেতে হচ্ছে। অন্যদিকে রয়েছে অদৃশ্য করের বোঝা। একজন দিনমজুর যখন দোকান থেকে এক প্যাকেট লবণ বা এক কেজি চাল কেনেন, তাকেও ঠিক ততটাই ভ্যাট দিতে হয়, যতটা একজন কোটিপতি দেন। এই বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থা বিশাল বাজেটের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক। বাজেটের অঙ্ক বড় করার তাগিদে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার যে উৎসব চলে, তাতে স্বস্তি জিনিসটা কর্পূরের মতো উড়ে যায়। বাজেট এলেই সবচেয়ে বেশি অসহায় বোধহয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তারা না পারে লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে, না পারে চড়া দামে বাজার থেকে নির্দ্বিধায় কিনে খেতে। সমাজের এই অংশটি তাদের আত্মসম্মানের চাদরে নিজেদের কষ্টগুলোকে ঢেকে রাখে। বাজেটে তাদের জন্য কখনোই তেমন কোনো সুখবর থাকে না। হয়তো করমুক্ত আয়সীমা সামান্য বাড়ে, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ে তার তুলনায় তা একেবারেই নগণ্য। সন্তানের স্কুলের বেতন, মাসের বাড়িভাড়া, আর হঠাৎ আসা অসুখের চিকিৎসা খরচ মেটাতে গিয়ে মাস শেষে বাবার যে বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়, তা বাজেটের কোনো পরিসংখ্যানেই জায়গা পায় না। সংসারের ঘানি টানতে টানতে মধ্যবিত্তের স্বপ্নগুলো আজ যেন বড় বাজেটের চাকায় পিষ্ট।
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। কিন্তু আমাদের বাজেটে এই খাতগুলোতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় সবসময়ই অপ্রতুল থাকে। সরকারি হাসপাতালে শয্যার অভাব, বিনা চিকিৎসায় প্রিয়জনের মৃত্যু, কিংবা টাকার অভাবে সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার যে বোবা কান্না বিশাল বাজেটের কোনো অংক দিয়ে কি তার পরিমাপ করা যায়? যখন একজন মাকে টাকার অভাবে তার অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসা মাঝপথে থামিয়ে দিতে হয়, তখন এই বিশাল বাজেটের গল্প তার কাছে এক নিষ্ঠুর তামাশা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। মেগা প্রজেক্ট বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন অবশ্যই জরুরি, কিন্তু মানুষের পেটে ক্ষুধা আর মনে দুশ্চিন্তা রেখে সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না।
বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব বা অঙ্কের খেলা নয়, এটি একটি জাতির আশা-আকাক্সক্ষার দলিল। আমরা এমন একটি বাজেট চাই, যা কেবল খাতা-কলমেই বড় হবে না, বরং মানুষের মনের স্বস্তি বাড়াবে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হোক, শ্রমিকের ঘামের সঠিক মূল্যায়ন হোক, মধ্যবিত্তের দুশ্চিন্তার ভাঁজ কমে আসুক এবং শিক্ষা ও চিকিৎসায় সাধারণ মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত হোক এটাই সবার কাম্য। অঙ্কের জৌলুসের চেয়ে সাধারণ মানুষের মুখের হাসির মূল্য অনেক বেশি। যেদিন বাজেটের আকার আর সাধারণ মানুষের জীবনের স্বস্তি দুটোই সমানতালে বড় হবে, যেদিন বাজারের থলে হাতে নিয়ে কোনো বাবাকে বাড়ি ফেরার পথে চোখের জল আর মুছতে হবে না, সেদিনই আমরা বলতে পারব আমাদের বাজেট সত্যি অর্থবহ হয়েছে। তার আগে পর্যন্ত, ‘বাজেটের অঙ্ক বড়, স্বস্তি ছোট’ এই আক্ষেপ আমাদের তাড়িয়ে বেড়াবে।
প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন