× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

সিলেট ব্যুরো

প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২৬, ০৫:৩২ এএম

পাথরকাণ্ড থেকে মাজারকাণ্ড

ডিসি সারোয়ারের বিদায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সিলেটে

সিলেট ব্যুরো

প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২৬, ০৫:৩২ এএম

ডিসি সারোয়ারের বিদায়ে  মিশ্র প্রতিক্রিয়া সিলেটে

সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারোয়ার আলমের জরুরি প্রত্যাহার ও বদলির আদেশকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এক পক্ষ যেখানে তাকে একজন সৎ, সাহসী ও জনবান্ধব কর্মকর্তা হিসেবে আখ্যায়িত করে বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে, অন্যপক্ষ ঠিক তেমনি তার কিছু উদ্যোগের আইনি ভিত্তি, কাজের ধারাবাহিকতা এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারের ব্যবস্থাপনা ও হিসাব-নিকাশ, সংস্কারের উদ্যোগ এবং দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা কিছু স্থানীয় প্রশাসনিক ইস্যু এই আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে। চলছে একদিকে আলোচনা, প্রতিবাদ। অন্যদিকে হচ্ছে সমালোচনাওÑ সিলেটবাসীর জনআকাক্সক্ষা পূরণ করতে না পারার।

এমন মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই গতকাল সোমবার হজরত শাহজালালের (র.) মাজারের ইতিহাসে ঘটে এক অভিনব ঘটনা। এদিন জোহরের নামাজের পর প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রকাশ্যে গণনা করা হয় মাজারের ঐতিহ্যবাহী ডেকচি ও দানবাক্সের টাকা। টানা চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই গণনা প্রক্রিয়ার দিকে নজর ছিল সবার। দিনশেষে জেলা প্রশাসন জানায়, ডেকচি ও প্রশাসনের রাখা ৯টি দানবাক্স মিলিয়ে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৯ টাকা নগদ পাওয়া গেছে। টাকার পাশাপাশি দানবাক্সে মিলেছে ৭ আনা পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কারও। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার মাজার কর্তৃপক্ষের ডেকচিগুলো সিলগালা করে দেয় প্রশাসন। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বসানো হয় আরও ৯টি বিশেষ দানবাক্স। পঞ্চম দিন অর্থাৎ সোমবার দুপুরে সিলেটের সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম নিজ উপস্থিতিতে এই ডেকচি ও বাক্সগুলো খোলার নির্দেশ দেন। এরপর স্বেচ্ছাসেবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে শুরু হয় টাকা গোনার কাজ। স্বচ্ছতা বজায় রেখে দীর্ঘ চার ঘণ্টার ম্যারাথন গণনা শেষে বিকেলে চূড়ান্ত হিসাবটি সামনে আসে।

তবে এই গণনায় কেবল টাকা আর সোনাই মেলেনি, মিলেছে এক অন্যরকম ভালোবাসার বার্তা। ভক্তদের দানের টাকার স্তূপের ভেতর পাওয়া গেছে একটি চিঠি। বিদায়ি জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের এমন সততা, সাহসিকতা ও স্বচ্ছ পদক্ষেপের ব্যাপক প্রশংসা করে কোনো এক ভক্ত আবেগঘন এই চিঠিটি ডেকচির ভেতর ফেলেছিলেন।

এদিকে একাধিক সূত্র জানায়, আলোচিত সাদাপাথর লুটপাট-সংক্রান্ত ঘটনার পর তৎকালীন ডিসি শের মাহবুব মুরাদের নাম অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ায় সিলেটে চলে তুলকালাম। ওই সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশব্যাপী আলোচিত মো. সারোয়ার আলমকে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে সিলেটে পাঠায় অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমদিকে ডিসি সারোয়ারের সিলেটে পাহাড়-টিলা কাটা বন্ধ করা, অবৈধ পাথর উত্তোলন রোধ, ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরের কোয়ারি নিয়ন্ত্রণ, যত্রতত্র কোরবানির পশুর হাট সীমিত করা এবং ওসমানী হাসপাতালে দালালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কিছু পদক্ষেপ স্থানীয় মহলে বেশ প্রশংসিত হয়। এ ছাড়া নগরীর ফুটপাত থেকে অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা উচ্ছেদ এবং যানজট নিরসনে অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে তার অভিযানও প্রশংসা কুড়ায়।

এর পাশাপাশি তার সময়ের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। সমালোচকদের প্রধান অভিযোগ, সাদাপাথর কা-ের যে বড় ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, দীর্ঘ এক বছরেও সেই তদন্ত রিপোর্ট তিনি প্রকাশ করতে পারেননি। এ ছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেট অংশের ভূমি অধিগ্রহণের কাজ দুই-তিন মাসের মধ্যে শেষ করার আশ^াস দিলেও ৯ মাসে তার এক-চতুর্থাংশও শেষ হয়নি। গত বছর নভেম্বরে ভূমিকম্পের পর এক সপ্তাহের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙার ঘোষণা দেন তিনি। পাশাপাশি শহরের জিন্দাবাজার ও বন্দরবাজারের কালেক্টরেট মসজিদ মার্কেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকার ব্যবসায়ীদের লিজ বাতিল ও উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের সঙ্গে প্রশাসন যথাযথ সমন্বয় না করায় ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে পুনর্বাসন নিশ্চিত না করে ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের ফলে অনেক দরিদ্র পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ হওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পাশাপাশি প্রশাসনের নিজস্ব ‘এলআর ফান্ড’ বা স্থানীয় তহবিলের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও হিসাব প্রকাশ্যে না এনে অন্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নৈতিক ভিত্তি নিয়েও চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা।

এসব বিতর্কের মধ্যেই সম্প্রতি জেলা প্রশাসক হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.) মাজারের ঐতিহ্যবাহী ৭০০ বছরের পুরোনো ব্যবস্থাপনা, দানবাক্স ও গরম ডেগের নিয়ন্ত্রণ এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। মাজারের নিরাপত্তা জোরদার, সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও ডিজিটাল সার্ভের মাধ্যমে জায়গা উদ্ধারের পরিকল্পনার পাশাপাশি তিনি ডেগ সিলগালা করে নতুন দানবাক্স বসানোর উদ্যোগ নেন। এই পদক্ষেপের পরপরই সরকারের পক্ষ থেকে তাকে প্রত্যাহারের আদেশ জারি করা হয়।

তার বদলির এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিলেটজুড়ে এখন স্পষ্ট দুটি ধারা দৃশ্যমান। এক পক্ষ মনে করছে, মাজারের কোটি কোটি টাকার হিসাব ও স্বচ্ছতা খুঁজতে গিয়ে ডিসি মূলত বছরের পর বছর ধরে সুবিধাভোগী একটি নির্দিষ্ট প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থে আঘাত করেছেন। দান-খয়রাত এবং মাজারের ভেতর দর্শনার্থীদের ওয়াশরুম ব্যবহারে টাকা নেওয়া, জুতা রাখার নামে অর্থ আদায় কিংবা ফকির-মিসকিনদের ওপর হয়রানি বন্ধের যে চেষ্টা তিনি করেছিলেন, তারই প্রতিক্রিয়া হিসেবে ‘মাজার ব্যবসায়ী’ ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের চাপে তাকে বিদায় নিতে হয়েছে।

ডিসির বদলিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়ে এবং এমন ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’-এর প্রতিবাদে স্থানীয়দের একটি অংশ, দর্শনার্থী ও সুশীল সমাজ মাজারের শৃঙ্খলা রক্ষা ও ডিসিকে স্বপদে বহালের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলও করেছেন। এমনকি এই সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণে ভুল বার্তা যাচ্ছে বলেও মনে করছেন অনেকে।

বিপরীতে মাজারের খাদেম, মাজার কমিটি ও বিশিষ্টজনদের একটি বড় অংশ এই বদলিকে দেখছেন ভিন্ন চোখে। তাদের মতে, শত শত বছর ধরে বংশপরম্পরায় চলে আসা মাজারের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রথাকে মাজার কমিটি বা অংশীজনদের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা না করে, ক্রমান্বয়ে ও পরিকল্পিতভাবে না এগিয়ে আচমকা ‘ক্যাডার স্টাইলে’ পরিবর্তন করার চেষ্টা ছিল একটি মারাত্মক ভুল ও আইনি এখতিয়ার বহির্ভূত পদক্ষেপ। দরগাহের মোতাওয়াল্লিসহ মাজার-সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, ওলির দরগাহের ওপর এই অনাকাক্সিক্ষত হস্তক্ষেপের কারণেই ‘অলৌকিক’ বা ‘প্রাকৃতিক’ বিচার হিসেবে এই প্রত্যাহার ত্বরান্বিত হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, গরম ডেগে হাত দিয়ে মূলত তিনি নিজের প্রশাসনিক ক্যারিয়ারেরই ক্ষতি করেছেন এবং এই ঘটনা ভবিষ্যতে অন্য কর্মকর্তাদের জন্য একটি বড় বার্তা হয়ে থাকবে।

গতকাল সোমবার ডিসি সারোয়ার আলম সিলেট থেকে ঢাকার ফ্লাইট ধরেন। এর আগে ঢুঁ মারেন মাজারে। তবে সেখানে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি। তার বিদায়ের দিন সকাল থেকে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে তার পক্ষে অনেককে স্লোগান দিতে দেখা যায়। তারা তাকে সিলেটে পুনর্বহাল চান। বিএনপির একটি অংশও চায়, সারোয়ার আলম যেন সিলেটে বহাল থাকেন।

এসব বিষয়ে হজরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহের মোতাওয়াল্লি মো. ফতেহ উল্লাহ আনাম বলেন, ‘আমরা কাউকে নালিশ করিনি। জানিও না কীভাবে, কেন তাকে প্রত্যাহার করা হলো। তিনি আল্লাহর ওলির দরগাহের ওপরে হস্তক্ষেপ করেছিলেন। হয়তো আল্লাহ বিচার করেছেন।’

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!