ওষুধ মানুষের জীবন বাঁচায়। কিন্তু সেই জীবনরক্ষাকারী ওষুধই যদি মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তাকে আর যাই হোক ‘ওষুধ’ বলা চলে না। বাংলাদেশে সম্প্রতি নকল, ভেজাল ও নি¤œমানের ওষুধের যে ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে, তা কেবল একটি অপরাধমূলক কর্মকা- নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ‘নীরব গণহত্যা’। চক পাউডার, ময়দা, স্টার্স আর কাপড়ের ক্ষতিকর রং দিয়ে তৈরি হচ্ছে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, ইনসুলিন কিংবা জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক। সাধারণ মানুষ কষ্টের টাকা দিয়ে ফার্মেসি থেকে রোগমুক্তির আশায় যে বড়ি বা ইনজেকশন কিনে বাড়ি ফিরছেন, তা আসলে তাদের ঠেলে দিচ্ছে এক অনিবার্য মৃত্যুর দিকে।
ওষুধ খাতের এই নৈরাজ্য আজ দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যকে যেমন চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে, ঠিক তেমনি আমাদের গর্বের ও সম্ভাবনাময় আন্তর্জাতিক ওষুধের বাজারকেও এক বিশাল ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।
সাধারণ রোগীর অন্তহীন ভোগান্তি ও স্বাস্থ্য বিপর্যয়
আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নি¤œ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয়ের একটি বিশাল অংশ চলে যায় চিকিৎসার পেছনে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্যমতে, বাংলাদেশের মানুষের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ খরচ হয় শুধু ওষুধ কিনতে। এই বিপুল খরচের পুরোটাই আজ অপচয়ের খাতায় চলে যাচ্ছে ভেজাল ওষুধের কারণে। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এক আশঙ্কাজনক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার ভেজাল ও নি¤œমানের ওষুধ বিক্রি হচ্ছে, যা মোট ওষুধের বাজারের একটি বড় অংশ দখল করে আছে।
এই আর্থিক ক্ষতির চেয়েও ভয়ংকর হলো মানুষের শারীরিক ক্ষতি। নকল ও নি¤œমানের ওষুধ সেবনের ফলে রোগ তো ভালো হয়ই না, উল্টো রোগের মেয়াদ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং চিকিৎসার খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নকল ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত নন-ফার্মাসিউটিক্যাল গ্রেডের রাসায়নিক এবং নি¤œমানের স্টেরয়েড মানবদেহের প্রধান অঙ্গÑ যেমন কিডনি ও লিভার সম্পূর্ণ বিকল (ঙৎমধহ ঋধরষঁৎব) করে দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষাক্ত উপাদান শরীরে প্রবেশ করার কারণে লিভার সিরোসিস, ফুসফুসের প্রদাহ ও ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে বড় অ্যালার্ম বা বিপদাশঙ্কা দেখা দিয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাপানের কানাজাওয়া ইউনিভার্সিটির এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ঢাকা শহরে বিক্রি হওয়া অ্যান্টিবায়োটিকের প্রায় ১০ শতাংশই নকল বা নি¤œমানের। নকল অ্যান্টিবায়োটিকে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করার মতো পর্যাপ্ত উপাদান না থাকায় শরীরের রোগজীবাণুগুলো উল্টো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এর ফলে মানবদেহে দ্রুত ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে কোনো আসল বা শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকও ওই রোগীর শরীরে আর কাজ করবে না। সামান্য অসুখ বা অস্ত্রোপচারের ইনফেকশনেই রোগীকে আর বাঁচানো সম্ভব হবে না। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস কিংবা ডেঙ্গুর মতো সংকটাপন্ন মুহূর্তে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ বা ইনজেকশন যখন নকল হয়, তখন রোগীর তাৎক্ষণিক মৃত্যু ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
আন্তর্জাতিক বাজার হারানোর শঙ্কা
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আমাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অন্যতম এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ মিটিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের কঠোর মানদ- পেরিয়ে আমাদের ওষুধ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। এই গৌরবময় অর্জন আজ অভ্যন্তরীণ বাজারের কিছু লোভী, অসাধু চক্রের কারণে ধূলিসাৎ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডঐঙ) মতে, নি¤œ ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রতি ১০টি চিকিৎসা পণ্যের মধ্যে ১টি ভেজাল বা নি¤œমানের। বাংলাদেশও এই তালিকার বাইরে নয়। দেশের বাজারে দেদার নকল ওষুধ তৈরি ও বিক্রির এই নেতিবাচক খবর যদি আন্তর্জাতিক মহলে বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা দেশের সামগ্রিক ওষুধ শিল্পের ভাবমূর্তি একেবারে ধ্বংস করে দেবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা যদি বাংলাদেশের ওষুধের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বা তদারকি কঠোর করেন, তবে কয়েক হাজার কোটি টাকার এ রপ্তানি বাজার হাতছাড়া হতে সময় লাগবে না। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর, তা দেখে আন্তর্জাতিক বাজার তাদের আমদানির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে। ফলে দেশের অভ্যন্তরের এই দুর্নীতি আমাদের পুরো অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাতকে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে।
আইনের প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সীমাবদ্ধতা
সরকার যে একদম হাত গুটিয়ে বসে আছে তা নয়। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ বছরে ৪৫টি ওষুধ কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে ২০টি কোম্পানির সব ধরনের ওষুধ উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছিল। এমনকি আইন কঠোর করতে পাস করা হয়েছে ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’, যেখানে ভেজাল ওষুধ উৎপাদনের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদ- এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। বিভিন্ন মোবাইল কোর্ট ও ড্রাগ কোর্টে হাজার হাজার মামলাও দায়ের করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে মাত্র ৩ মাসেই প্রায় ৩৪ কোটি টাকার ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ধ্বংস করার নজিরও রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত সব উদ্যোগের পরও কেন এই চক্র থামছে না? এর মূল কারণ আমাদের তদারকি ব্যবস্থার চরম সীমাবদ্ধতা। দেশে বছরে প্রায় ২৫,০০০ ধরনের ওষুধ তৈরি হলেও সরকারি ল্যাবে মাত্র ৪,০০০ ওষুধ পরীক্ষা করার সামর্থ্য রয়েছে। বাকি ২১,০০০ ওষুধ কোনো ল্যাব টেস্ট ছাড়াই বাজারে চলে যাচ্ছে। এই বিশাল ফাঁকফোকর গলে অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল ও উপজেলা পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণহীন খুচরা বাজারগুলোকে নকল ওষুধের অভয়ারণ্য বানিয়ে তুলেছে।
উত্তরণের উপায়
এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে শুধু কাগজের কলমে আইন থাকলে চলবে না, তার কঠোর ও দৃশ্যমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। যাবজ্জীবন কারাদ-ের মতো কঠোর শাস্তি দু-একটি ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত কার্যকর করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জনবল ও ল্যাবরেটরির সক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে হবে, যাতে উৎপাদিত প্রতিটি ওষুধের ব্যাচ ল্যাব টেস্টের আওতায় আনা সম্ভব হয়।
ওষুধের প্রতিটি পাতায় বা বোতলে বারকোড বা ‘ইউনিক ট্র্যাকিং সিস্টেম’ চালু করা এখন সময়ের দাবি, যার মাধ্যমে একজন সাধারণ ক্রেতাও স্মার্টফোন দিয়ে স্ক্যান করে বুঝতে পারবেন ওষুধটি আসল নাকি নকল। একই সঙ্গে দেশের রপ্তানি বাজারকে রক্ষা করতে হলে ওষুধ শিল্প সমিতিকে নিজেদের উদ্যোগে কালো তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ওষুধ খাতের এই নৈরাজ্য শুধু কিছু টাকার ক্ষতি নয়Ñ এটি দেশের মানুষের আয়ু কেড়ে নিচ্ছে, রাষ্ট্রকে পঙ্গু করছে এবং বৈশ্বিক দরবারে দেশের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। এই নীরব গণহত্যা এখনই বন্ধ না হলে, আগামী দিনের বাংলাদেশ এক পঙ্গু ও রুগ্ণ প্রজন্মে পরিণত হবে, যার দায় কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন