বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের রোমাঞ্চ এখন তুঙ্গে। মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করার পর, দ্বিতীয় ম্যাচে হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলের দাপুটে জয়ে চেনা ছন্দে ফিরেছে ব্রাজিল। তবে গ্রুপ পর্বের আসল পরীক্ষা এখনো বাকি। আগামীকাল মিয়ামি স্টেডিয়ামে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে স্কটল্যান্ড। মাঠের লড়াইয়ের সমীকরণ যখন নকআউটের টিকিট নির্ধারণ করবে, ঠিক তখনই ব্রাজিল শিবিরে বড় সুসংবাদ! ইনজুরি কাটিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাঠে ফিরছেন দলের প্রাণভোমরা নেইমার জুনিয়র। একদিকে নেইমারের প্রত্যাবর্তন, অন্যদিকে স্কটল্যান্ডের মরণ-বাঁচন লড়াই; সব মিলিয়ে মিয়ামির এই ম্যাচটি রূপ নিয়েছে এক ক্ল্যাসিক ফুটবল দ্বৈরথে।
স্কটল্যান্ডের লড়াকু মানসিকতা
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে হাইতিকে ১-০ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্টে দারুণ সূচনা করেছিল স্কটল্যান্ড। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে মরক্কোর কাছে ১-০ গোলের ব্যবধানে হেরে তাদের নকআউটের সমীকরণ কিছুটা জটিল হয়ে পড়েছে। স্কটিশ কোচ স্টিভ ক্লার্কের অধীনে দলটি মূলত তাদের রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা এবং কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবলের জন্য পরিচিত। দলের অধিনায়ক এবং লিভারপুল তারকা অ্যান্ডি রবার্টসন রক্ষণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা। মধ্যমাঠে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের স্কট ম্যাকটমিনে এবং অ্যাস্টন ভিলার জন ম্যাকগিন স্কটল্যান্ডের শক্তির মূল উৎস। দল হিসেবে স্কটল্যান্ড অত্যন্ত ফিজিক্যাল ফুটবল খেলে এবং সেট-পিস থেকে গোল আদায়ে তারা দারুণ পারদর্শী। মরক্কোর কাছে হারলেও তাদের লড়াকু মানসিকতা ব্রাজিলকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে, বিশেষ করে যখন শেষ ষোলোতে যেতে স্কটিশদের এই ম্যাচ থেকে পয়েন্ট পাওয়া ভীষণ জরুরি।
অতীত পরিসংখ্যান
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে ব্রাজিল এবং স্কটল্যান্ডের অতীত দ্বৈরথে ল্যাটিন আমেরিকান পরাশক্তিদের একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা যায়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দল দুটি এ পর্যন্ত ১০ বার মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে ৮ বারই জিতেছে ব্রাজিল এবং বাকি ২টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। স্কটল্যান্ড আজ পর্যন্ত সেলেসাওদের বিপক্ষে কোনো জয়ের মুখ দেখেনি। বিশ্বকাপ মঞ্চেও এই দুই দলের দেখা হয়েছে চারবার। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে গোলশূন্য ড্রয়ের পর ১৯৮২ বিশ্বকাপে ব্রাজিল জিতেছিল ৪-১ গোলে, ১৯৯০ বিশ্বকাপে ১-০ গোলে এবং ১৯৯৮ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল সাম্বা বয়েজ। ২০১১ সালের সর্বশেষ প্রীতি ম্যাচেও নেইমারের জোড়া গোলে ২-০ ব্যবধানে জিতেছিল ব্রাজিল। অতীত পরিসংখ্যান যতই ব্রাজিলের পক্ষে কথা বলুক না কেন, বিশ্বকাপের মঞ্চে যেকোনো দলই যে অঘটন ঘটাতে পারে, তা ভালো করেই জানেন সেলেসাও ডিফেন্ডাররা।
নেইমার ম্যাজিক
ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ভক্তদের জন্য এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নেইমারের মাঠে ফেরা। প্রথম দুই ম্যাচে চোটের কারণে সাইডলাইনে বসে থাকতে হয়েছিল এই তারকা ফরোয়ার্ডকে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো এবং রাফিনিয়ারা হাইতির বিপক্ষে আক্রমণভাগে দুর্দান্ত খেললেও নেইমারের অভিজ্ঞতা এবং সৃষ্টিশীলতার অভাব কিছুটা হলেও টের পেয়েছে দল। কোচ কার্লো আনচেলত্তির আক্রমণাত্মক ছকে নেইমারের অন্তর্ভুক্তি ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে আরও ধারালো করবে। স্কটল্যান্ডের জমাট রক্ষণভাগ ভাঙতে নেইমারের ড্রিবলিং, নিখুঁত পাসিং এবং ফ্রি-কিক দলের জন্য এক্স-ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। প্র্যাকটিস সেশনে পূর্ণ ফিটনেস ফিরে পাওয়ার পর নেইমার নিজেই মুখিয়ে আছেন মিয়ামির মাঠ মাতাতে।
রণকৌশলের লড়াই
মিয়ামি স্টেডিয়ামে ম্যাচটি মূলত হতে যাচ্ছে ব্রাজিলের শৈল্পিক আক্রমণ বনাম স্কটল্যান্ডের ইস্পাতকঠিন রক্ষণের লড়াই। কার্লো আনচেলত্তি সম্ভবত ৪-৩-৩ ফর্মেশনেই দলকে মাঠে নামাবেন, যেখানে ভিনিসিয়ুস এবং রাফিনিয়া দুই প্রান্ত দিয়ে গতি সচল রাখবেন আর নেইমার মাঝমাঠ ও আক্রমণের সংযোগ হিসেবে খেলবেন। অন্যদিকে স্কটিশ কোচ স্টিভ ক্লার্কের ফর্মেশন হতে পারে ৫-৩-২ বা ৪-৫-১, যার মূল লক্ষ্য থাকবে ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে নিজেদের বক্সে জায়গা না দেওয়া। হাইতির বিপক্ষে ৩ গোল করা ব্রাজিলকে রুখতে স্কটল্যান্ড প্রথম থেকেই নিজেদের অর্ধে ডিফেন্সিভ ব্লক তৈরি করে কাউন্টার অ্যাটাকের ওপর নির্ভর করবে। ম্যাকটমিনের দূরপাল্লার শট এবং সেট-পিস থেকে বক্সের ভেতর বল ভাসিয়ে ব্রাজিলের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করবে স্কটিশরা।
ম্যাচের সম্ভাবনা
কাগজে-কলমে এবং সাম্প্রতিক ফর্মে ব্রাজিল এই ম্যাচে পরিষ্কার ফেভারিট। ভিনিসিয়ুসের দুর্দান্ত ফর্ম এবং নেইমারের ফেরা ব্রাজিলকে মানসিকভাবে অনেকটাই এগিয়ে রাখছে। তবে স্কটল্যান্ডকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু নকআউটে যেতে স্কটিশদের অন্তত এক পয়েন্ট প্রয়োজন, তাই তারা মাঠে নিজেদের উজাড় করে দেবে। ম্যাচের শুরুর দিকে যদি স্কটল্যান্ড ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে আটকে রাখতে পারে, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাজিলের ওপর চাপ বাড়বে। কিন্তু ব্রাজিলের যে স্কোয়াড ডেপথ এবং একক নৈপুণ্য রয়েছে, তাতে ম্যাচের যেকোনো মুহূর্তে তারা ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে সক্ষম।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন