পৃথিবী যেন ক্রমেই প্রবেশ করছে এক নতুন জলবায়ুগত বাস্তবতায়। একদিকে ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী ‘এল নিনো’ পরিস্থিতির উদ্ভব নিয়ে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, এই দুই পরিস্থিতির সম্মিলিত প্রভাবে আগামী মাসগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দিতে পারে অস্বাভাবিক গরম, খরা, বন্যা, খাদ্য সংকট এবং পরিবেশগত বিপর্যয়।
সম্প্রতি পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপে তাপমাত্রা একের পর এক রেকর্ড ভাঙছে। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, বেলজিয়াম ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা। অনেক এলাকায় স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে, পরিবর্তন আনা হয়েছে দৈনন্দিন কার্যক্রমে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও বাড়ছে চাপ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ফ্রান্সে। দেশটিতে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছে দুই শিশু, যারা একটি বন্ধ গাড়ির ভেতরে দীর্ঘ সময় আটকে ছিল। অতিরিক্ত তাপের কারণে তারা প্রাণ হারায়। এ ছাড়া প্রবীণদের মধ্যে তাপজনিত অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
ফ্রান্সের পশ্চিমাঞ্চলীয় আঙুর চাষ অঞ্চল বোর্দোতে তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা স্থানীয় ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ। মধ্যাঞ্চলের পোয়াতিয়ে শহরেও প্রায় আট দশক পুরোনো তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে গেছে। রাজধানী প্যারিসেও জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্পেনের উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলো, যেগুলো সাধারণত তুলনামূলক শীতল হিসেবে পরিচিত, সেখানেও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছেছে। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, দেশটিতে জুন মাসের বহু পুরোনো তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে। ইতালির একাধিক শহরে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ মাত্রার তাপপ্রবাহ সতর্কতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপে চলমান এই তাপপ্রবাহের পেছনে রয়েছে ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ আবহাওয়াগত অবস্থা। গ্রিক বর্ণ ‘ওমেগা’র আকৃতির মতো দেখতে এই উচ্চচাপ বলয়টি বায়ুম-লে স্থির হয়ে থাকে এবং দীর্ঘ সময় ধরে গরম বাতাসকে একটি অঞ্চলে আটকে রাখে। একই সঙ্গে এটি উত্তর আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি থেকে উষ্ণ ও শুষ্ক বায়ু টেনে ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়।
এই অবস্থার কারণে স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ ব্যাহত হয় এবং আকাশ পরিষ্কার থাকায় সূর্যের তাপ সরাসরি ভূপৃষ্ঠে পড়ে। ফলে তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ অবস্থায় থাকে। আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি এখন আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হয়ে দেখা দিচ্ছে।
ইউরোপ যখন দাবদাহে পুড়ছে, ঠিক তখনই নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে প্রশান্ত মহাসাগরের পরিস্থিতি। মহাকাশ ও জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সেখানে শক্তিশালী ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি গড়ে উঠছে।
‘এল নিনো’ হলো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া, যা নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বেড়ে গেলে সৃষ্টি হয়। সাধারণত কয়েক বছর পরপর এই ঘটনা ঘটে। তবে যখন এর তীব্রতা অনেক বেশি হয়, তখন তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়।
সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, উষ্ণ পানি প্রসারিত হয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়ে দেয়। তাই সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন জলবায়ুর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনোতে রূপ নিতে পারে। কেউ কেউ মনে করছেন, গত শতাব্দীর শেষভাগের ভয়াবহ এল নিনোর চেয়েও শক্তিশালী পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্ক রয়েছে।
এল নিনোর প্রভাব কেবল সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশে^। কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দেয়, আবার কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা ও পানির সংকট সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাত ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মধ্য আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় খরার আশঙ্কা রয়েছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শক্তিশালী এল নিনো অনেক সময় খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে। খরা, বন্যা ও অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে ফসল নষ্ট হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে খাদ্য সংকট। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনাও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার যুগে বিশ্ব আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে এবং সমুদ্রে তাপ সঞ্চয়ের পরিমাণও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানবসৃষ্ট উষ্ণতা ইতোমধ্যে বিপজ্জনক সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর তাপমাত্রা শিল্পায়ন-পূর্ব সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই তা আরও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে তাপপ্রবাহ, খরা, ঝড়, অতিবৃষ্টি এবং দাবানলের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীকে নিরাপদ রাখতে হলে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিতে এখনই আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় আগামী বছরগুলোতে চরম আবহাওয়ার মূল্য মানবসভ্যতাকেই আরও বড় পরিসরে পরিশোধ করতে হতে পারে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন