দেশের নিবন্ধিত অভিজাত ক্লাবগুলোর সদস্যদের অগ্রিম করের আওতায় আনতে যাচ্ছে সরকার। ফলে ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, উত্তরা ক্লাবসহ দেশের বিভিন্ন নিবন্ধিত অভিজাত ক্লাবের সদস্যদের নির্দিষ্ট হারে অগ্রিম কর পরিশোধ করতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের কর নেটওয়ার্কে আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলো সদস্যপদ নবায়ন বা বার্ষিক চাঁদা আদায়ের সময় নির্ধারিত অগ্রিম কর সংগ্রহ করে সরকারি কোষাগারে জমা দেবে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, অভিজাত ক্লাবগুলোর সদস্যদের একটি বড় অংশ উচ্চ আয় ও উচ্চ ব্যয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে তাদের কর-সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা সহায়ক হবে। এ ছাড়া অগ্রিম কর পরিশোধ করলেও তা পরে সদস্যদের চূড়ান্ত আয়কর হিসাবের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে।
নতুন এই উদ্যোগকে কর আদায় বৃদ্ধি এবং কর সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ক্লাব সদস্যদের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ এটিকে কর-ব্যবস্থার আধুনিকায়নের পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানালেও অনেকে অতিরিক্ত আর্থিক চাপের আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বিধান অনুসারে, কোনো অভিজাত ক্লাবের সদস্যপদ গ্রহণ বা নবায়নের ক্ষেত্রে সম্পাদিত আর্থিক লেনদেনের ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর আরোপ করা হবে। এই কর আদায়ের দায়িত্ব থাকবে সংশ্লিষ্ট ক্লাব কর্তৃপক্ষের।
নতুন বিধান কার্যকর হলে কোনো ব্যক্তি যদি কোটি টাকায় কোনো অভিজাত ক্লাবের সদস্যপদ গ্রহণ করেন, তাহলে সদস্যপদের মূল্যের পাশাপাশি তাকে ১০ লাখ টাকা উৎসে করও পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ, ১ কোটি টাকার সদস্যপদের সঙ্গে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর বাবদ ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে। সদস্যপদ বিক্রির সময় ক্লাব কর্তৃপক্ষ এ কর সংগ্রহ করবে। একইভাবে সদস্যপদ নবায়নের ক্ষেত্রেও লেনদেনের ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর প্রযোজ্য হবে। তবে ক্লাব সদস্যদের মাসিক, ত্রৈমাসিক বা বার্ষিক চাঁদার ক্ষেত্রে এ কর প্রযোজ্য হবে না।
অর্থ বিলের নতুন বিধানে বলা হয়েছে, সোসাইটি নিবন্ধন বা অন্য কোনো আইনের আওতায় নিবন্ধিত ক্লাবগুলোকে এ কর ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। সদস্যপদ গ্রহণ, নবায়ন, হস্তান্তর কিংবা পরিবর্তনের জন্য পরিশোধিত অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখবে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। পরে এনবিআর ক্লাবগুলোর কাছ থেকে ওই কর সংগ্রহ করবে।
ঢাকা ক্লাব দেশের প্রাচীনতম ক্লাবগুলোর একটি। এটি নিবন্ধিত হয় ১৯১১ সালে। বর্তমানে ক্লাবটির সদস্যসংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৮০০। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অল্প সময়ের মধ্যেই এ সংখ্যা সাড়ে ৪ হাজারে পৌঁছাতে পারে।
নতুন কর-ব্যবস্থার বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেছেন ঢাকা ক্লাবের পরিচালক মো. রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এই করের বিষয়ে প্রথম শুনলাম। আমরা সদস্যপদ স্থানান্তরের সময় ৬ লাখ টাকা ফি নিয়ে থাকি। এখন উৎসে কর নেওয়া হলে সরকার হয়তো ৬০ হাজার টাকা নিয়ে যাবে। সদস্যরা যার যার ক্ষেত্রে সব ধরনের কর দেন। এখন নতুন করে এখানে করারোপ করা হলে তা ক্লাবের আয়ের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারে।
১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত গুলশান ক্লাব বর্তমানে ২ হাজারের বেশি সদস্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে ১৯৯২ সালে যাত্রা শুরু করা উত্তরা ক্লাব লিমিটেডের সদস্যসংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। বনানী ক্লাব, চট্টগ্রাম ক্লাবসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অভিজাত ক্লাবগুলোর সদস্যসংখ্যাও প্রায় একই ধরনের।
রাজস্ব কর্মকর্তারা মনে করছেন, অভিজাত ক্লাবের সদস্যদের করের আওতায় আনা গেলে করজাল আরও বিস্তৃত হবে এবং এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।
এদিকে, ১০ শতাংশ করের বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন এনবিআরের আয়কর বিভাগের এক কর্মকর্তা। তিনি জানান, ঢাকার প্রথম সারির ১০টি ক্লাবের প্রতিটির সদস্যসংখ্যা হাজারের বেশি। একেকটি ক্লাবে সদস্যপদ গ্রহণ ও স্থানান্তর ফি গড়ে ৫০ লাখ টাকার কম নয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন নতুন ক্লাব গড়ে উঠছে এবং সদস্যসংখ্যাও বাড়ছে। নতুন উদ্যোগের ফলে রাজস্ব বাড়বে বলে মনে করছেন তিনি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন