বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৩ (উত্তরা-দিয়াবাড়ি) কার্যালয়ের ফিটনেস শাখাকে ঘিরে দালাল চক্রের সক্রিয়তা, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সেবা গ্রহীতাদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফি পরিশোধ ও নিয়ম মেনে আবেদন করলেও কাক্সিক্ষত সেবা পেতে তাদের নানা ধরনের হয়রানি, বিলম্ব এবং অযৌক্তিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অন্যদিকে দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করলে তুলনামূলক দ্রুত সময়ে ফিটনেস সনদ পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, একটি গাড়ির ফিটনেস সনদ নবায়ন বা নতুন সনদ পেতে সরকারি ফির বাইরে এক হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করে দালালদের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় বলেও অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাগ্রহীতা।
পরিবহন মালিক, আজম, মালেক, আব্দুল গনি, সামাদসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, সরকারি ফির বাইরে এক হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। তাছাড়া বিআরটিএ উত্তরা-দিয়াবাড়ি কার্যালয়ে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েছে দ্বিগুণ। এর সঙ্গে কর্মকর্তারাই জড়িত। পাশাপাশি বলা যায়, উত্তরা-দিয়াবাড়ি কার্যালয় এখন দালাল চক্রের নিয়ন্ত্রণে, যেটা নিয়ে কথা বলার মতো কেউ নেই।
এক পরিবহন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নিয়ম মেনে লাইনে দাঁড়ালে ফাইল বারবার ফেরত দেওয়া হয়। কিন্তু দালালের মাধ্যমে গেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাজ হয়ে যায়।’
সংশ্লিষ্টদের দাবি, অফিস চলাকালেই কার্যালয়ের ভেতর ও আশপাশে দালালদের প্রকাশ্য তৎপরতা দেখা যায়। তারা আগত গ্রাহকদের কাছে গিয়ে দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত সেবা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে কাজ করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতি চললেও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর অভিযান বা স্থায়ী সমাধান দেখা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষ অনেক সময় বাধ্য হয়ে দালালদের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো, যান্ত্রিক ত্রুটি থাকা বা প্রকৃতপক্ষে সড়কে চলাচলের অনুপযোগী কিছু যানবাহনও অর্থের বিনিময়ে ফিটনেস সনদ পেয়ে যাচ্ছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, সরাসরি জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। কারণ ফিটনেস সনদের মূল উদ্দেশ্যই হলো সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অতীতেও ফিটনেস সনদ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে : অতীতেও ফিটনেস সনদ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২২ সালে একটি ট্রাক পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় পরিদর্শন ছাড়াই ফিটনেস সনদ পেয়েছিল বলে জাতীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ এসেছে যে, কিছু ক্ষেত্রে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই যানবাহনকে ফিটনেস সনদ দেওয়া হয়েছে এবং দালাল চক্রের মাধ্যমে সনদ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিআরটিএতে দালাল ও ঘুষের অভিযোগ নতুন নয় : বিআরটিএতে দালাল ও ঘুষের অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৬ সালে বিআরটিএর এক গণশুনানিতে সেবাগ্রহীতারা সরাসরি অভিযোগ করেন যে, ঘুষ ছাড়া ফিটনেস সনদসহ বিভিন্ন সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং দালালদের মাধ্যমে কাজ করানোর চাপ সৃষ্টি করা হয়। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ তখন অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছিল। ২০১৮ সালে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছিল, বিআরটিএর কিছু কার্যালয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সেবা নিতে গেলে ভোগান্তি পোহাতে হয়, অথচ অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে অনেকেই সহজে ফিটনেস সনদ সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। বিআরটিএর একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, পরীক্ষার আওতায় আসা বাসগুলোর প্রায় ৩৩ শতাংশের ফিটনেস সংক্রান্ত অসঙ্গতি ছিল। একই প্রতিবেদনে বিভিন্ন যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটিও উঠে আসে। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ফিটনেস পরীক্ষা কার্যকর না হলে ব্রেক, স্টিয়ারিং, টায়ার, ধোঁয়া নির্গমন ও অন্যান্য নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও যানবাহন সড়কে চলতে পারে, যা প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। হয়রানির শিকার হলেও অনেক সেবাগ্রহীতা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না। তাদের আশঙ্কা, অভিযোগ করলে ভবিষ্যতে ফাইল আটকে দেওয়া, অযৌক্তিক জটিলতা সৃষ্টি করা কিংবা প্রয়োজনীয় সেবা পেতে বিলম্বের মুখোমুখি হতে হতে পারে। এক ট্রাক মালিক বলেন, ‘আজ অভিযোগ করলে কাল আবার এই অফিসেই কাজ করতে হবে। তাই অনেকে চুপ থাকেন।’
একাধিক সেবাগ্রহীতা ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৩ এর মোটরযান পরিদর্শক কায়সার আলমের নাম উল্লেখ করে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সম্পৃক্ততার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি এসব কর্মকা-ের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নই। আর মোবাইলে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়।’ দূরপাল্লার পরিবহন মালিক, স্থানীয় পরিবহন উদ্যোক্তা ও চালকদের দাবি, শুধু লিখিত অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে বিআরটিএ সদর দপ্তর, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ ও আকস্মিক তদন্ত পরিচালনা করা উচিত। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ‘সরকারি সেবা পেতে যদি দালালের দ্বারস্থ হতে হয়, তাহলে ডিজিটালাইজেশনের সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। দালালমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশে সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ)-এর বর্তমান পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শফিকুজ্জামান ভূইয়া জানান, আমরা সব অভিযোগ আমলে নিয়ে কাজ করছি। কাউকে ছাড় দিচ্ছে না, দালালমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশে সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন