জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী, দুই দলকেই একে অন্যেকে সম্মান ও যৌক্তিক কারণে সহযোগিতা করার মানসিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। দেশের স্বার্থে তিনি সরকারি দলের প্রতি ‘একটি ওয়ান্ডারফুল কম্বিনেশন’ নিয়ে চলারও তাগিদ দিয়েছেন। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে তিনি বলেন, একটা চমৎকার টেনডেন্সি (প্রবণতা) আমি লক্ষ করেছি, সরকারি দলের প্রায় সব বক্তা বিরোধী দলের বক্তব্য কুচি কুচি করে কাটার পরে বলেন, এগুলো ছাড়েন। আসেন ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা দেশটা চালাই। ওই কুচি কুচি করার যন্ত্রটা আসুন আমরা ফেলে দিই। আমরা একটা বিউটিফুল, ওয়ানডারফুল কম্বিনেশন নিয়ে চলি।
এর অর্থ এটি নয় যে, সরকারি দলের যেটা অভিপ্রায়, বুঝে না বুঝে সেটাই হবে বিরোধী দলের অভিপ্রায়। আবার এর অর্থ এটিও নয় যে, সরকারি দল সংগত কোনো বিষয় নিয়ে সামনে আগালে বিরোধী দল বিরোধিতার খাতিরে শুধু বিরোধিতাই করে যাবে, এই দুইটার কোনোটাই না। সরকারি দলকেও বিরোধী দলকে সম্মান করার মানসিকতা থাকতে হবে, আর বিরোধী দলেরও সংগত সব ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করার মানসিকতা থাকতে হবে। এই কথাটি আমরা প্রথম দিনেই বলে রেখেছি।’
গতকাল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির এসব কথা বলছিলেন। এ সময় আমির বলেন, ‘সরকারি দলকেও বিরোধী দলকে সম্মান করার মানসিকতা থাকতে হবে। বিরোধী দলকেও সরকারি দলকে সহযোগিতা করার মানসিকতা থাকতে হবে।’
স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ করে শফিকুর রহমান বলেন, মাননীয় স্পিকার, অতীত অভিজ্ঞতা আপনার আছে। আমার নেই। এখানে আরও কয়েকজন আছেন, অতীতেও ছিলেন। আমরা বেশির ভাগই নবীন, আর নবীনদের অধিকার থাকে প্রবীণদের কাছ থেকে শেখার। কিন্তু আমরা মন্দটা শিখতে চাই না। আমরা শিখতে চাই ভালোটা। অতীতে এই সংসদে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিকে তোষামোদ করার জন্য গান হয়েছে, কবিতা হয়েছে, স্বপ্নবিলাস হয়েছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে এই সংসদে এটা হওয়া উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, এটা তোষামোদের জায়গা নয়, এটা দায়িত্ব পালনের জায়গা। দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জায়গা। দায়িত্ব পালন করার জায়গা। অনেক সময় ব্যক্তিকে খুশি করতে গিয়ে অন্যকে আমরা বেশি করে আঘাত করি। আমি প্রথম দিন অনুরোধ করেছিলাম অতীতের ব্যাড কালচারকে আমরা না করি। এই সংসদে দাঁড়িয়ে চরিত্র হনন যেন না হয়।
বক্তব্যের শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জেনারেল এম এ জি ওসমানী, আ স ম আবদুর রবসহ সব শহিদ ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের। নব্বই গণআন্দোলন, ২৪ অভ্যুত্থানের শহিদ, পিলখানা হত্যাকা-ের শহিদদেরও স্মরণ করেন আমির। তিনি বলেন, আমরা একটি কষ্টে ভোগা দল। এক-দুই করে ১১ জনকে আমাদের বুক থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এ সময় বাঁ-দিকের আসনে উপবিষ্ট জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলামকে দেখিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘১২ নম্বর জন এখানে জীবিত আছেন।’
জামায়াতের আমির বলেন, সরকারি দল বাজেটের প্রশংসা করতে থাকুক, বিরোধী দল হালকা ও ভারী প্রশংসার সঙ্গে ওয়াচডগের কাজটাও করে যাক।
এদিকে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে প্রচলিত অর্থবছরকে পরিবর্তন করে ‘ক্যালেন্ডার বর্ষ’ (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) অনুযায়ী করার প্রস্তাব দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা। একই সঙ্গে ‘অবহেলায় ছয় নবজাতকের মৃত্যু’র ঘটনায় সরকার কর্তৃক বন্ধ করে দেওয়া রাজধানীর আলোচিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালটি ‘জনস্বার্থ’ ও ‘একাডেমিক দিক বিবেচনা’ করে সেটি অবিলম্বে চালুর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, দেশের প্রকৃত অগ্রগতির জন্য অর্থবছরের হিসাবটি ক্যালেন্ডার বর্ষের সঙ্গে মিল রেখে গড়া দরকার। এ ছাড়া আদ্-দ্বীন হাসপাতালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শৃঙ্খলা ও প্রয়োজনীয় দ- নিশ্চিত করে হলেও একাডেমিক ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার স্বার্থে হাসপাতালটি দ্রুত খুলে দেওয়া উচিত।
এদিকে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে সময় নির্ধারণে নজিরবিহীন বৈষম্য ও নিজেদের সময় কেটে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছে জামায়াতে ইসলামী। রোববার রাতে সংসদে ঘটে যাওয়া এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে সোমবার এক ব্রিফিংয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান এ অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, গতকাল সংসদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বক্তব্য রাখার নির্ধারিত সময় থেকে ৫ মিনিট করে কেটে নেওয়া হয়েছে। গতকাল আমাদের মাত্র তিনজন সংসদ সদস্য বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছিলেন। অথচ সরকার দলীয় সদস্যদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বক্তব্য দিতে ওঠেন, তখন তার নির্ধারিত ৪০ মিনিট সময়কে বাড়িয়ে এক ঘণ্টারও বেশি সময় কথা বলতে দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন