× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ০৬:০৭ এএম

দালালের ফাঁদে পড়ে রাশিয়ার রণক্ষেত্রে বিভীষিকাময় জীবন

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ০৬:০৭ এএম

দালালের ফাঁদে পড়ে রাশিয়ার  রণক্ষেত্রে বিভীষিকাময় জীবন

ভালো বেতনে রাশিয়ার নামী কোম্পানিতে কনস্ট্রাকশন কাজের লোভ দেখিয়েছিল দালালরা। তাদের কথায় বিশ^াস করে শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ৩০ যুবক। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর মোটা অঙ্কের টাকায় রুশ বাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় তাদের। এখন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন তাদের অনেকে। কেউ কেউ আহত হয়ে কাতরাচ্ছেন চিকিৎসা শিবিরে। সবাই বেঁচে আছেন কি না, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়।

জানা গেছে, ঢাকার একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার ৩০ জনের একটি দলকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। পাঠানোর আগে প্রলোভন দেখানো হয় রাশিয়ার একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে বাংলাদেশি ৯০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর দালালরা তাদের বিক্রি করে দেয়। এরপর তাদের রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে ভারী অস্ত্র হাতে লড়াই করতে বাধ্য করা হয়। এই যুবকদের অনেকেই এখন বোমারু ড্রোনের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। ইউক্রেনের এক চিকিৎসা শিবির (ক্যাম্প) থেকে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে পরিবারের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তারা।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার জুড়ান মোল্লাপাড়া (কুমড়াকান্দি) এলাকার আবদুল হকের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড় আলী হাসান সোহেল। এলাকায় অটোরিকশা চালিয়ে কোনো রকমে চলত তার সংসার। প্রায় এক বছর আগে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর এলাকার ইমরান হোসেন নামে এক দালালের খপ্পরে পড়েন তিনি। তার সঙ্গে গোপালগঞ্জ সদরের পলাশ শেখ, রনি ও সৌরভ মোল্লাসহ ৩০ জন ছিলেন। দালাল ইমরান ৬০ হাজার রুবল (বাংলাদেশি প্রায় ৯০ হাজার টাকা) বেতনে রাশিয়ায় কোম্পানিতে চাকরির প্রলোভন দেখায়। সরল বিশ^াসে ধারদেনা করে ৭ লাখ টাকা জোগাড় করে ইমরানের হাতে তুলে দেয় সোহেলের পরিবার। গত ৭ মে বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে আরও অনেকের সঙ্গে রাশিয়ার উদ্দেশে উড়াল দেন সোহেল।

অভিযোগ উঠেছে, রাশিয়ার বিমানবন্দরে নামার পর এক নারী প্রতিনিধি তাদের রিসিভ করেন। এরপর একটি হোটেলে ৩ দিন আটকে রেখে তাদের একেকজনকে ৩০ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেয় ওই চক্র। মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। কেটে ফেলা হয় তাদের মাথার চুল। পরানো হয় সামরিক পোশাক। দেওয়া হয় সামরিক কিছু প্রশিক্ষণ। এরপর হাতে ভারী অস্ত্র তুলে দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয় রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেনের রণক্ষেত্রে। এর কয়েকদিন পর সুযোগ পেয়ে তারা এসএমএস ও ভয়েস মেসেজে পরিবারের সদস্যদের জানান, তাদের প্রত্যেককে রাশিয়ান বাহিনীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

ইউক্রেনের ক্রাসনদো শহরের একটি অস্থায়ী চিকিৎসাশিবির থেকে আহত সোহেল ফোনে তার স্বজনদের কাছে বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমাদের ৩০ জনকে ১৬ ও ১৪ জনের দুটি দলে ভাগ করা হয়। রাশিয়ান সেনারা ক্যাম্পে বসে ড্রোনে নজরদারি করত আর আমাদের ঠেলে দিত মৃত্যুর মুখে। রাস্তার কোথায় মাইন পোঁতা আছে কিংবা কোথা থেকে ড্রোন হামলা হতে পারেÑ তা পরীক্ষা করতে আমাদের ‘টোপ’ হিসেবে আগে পাঠানো হতো। আমাদের দলের ১২ জনের কোনো খোঁজ নেই। তারা হয়তো আর বেঁচে নেই।  তিনি আরও জানান, গত ১৩ জুন ড্রোন ও মাইনের আঘাতে তিনি ও গোপালগঞ্জের পলাশ শেখ গুরুতর আহত হন। বর্তমানে তারা কানে শুনতে পাচ্ছেন না। হাত-শরীর জখম। তিন দিন আগে ঝিনাইদহের রাজন নামে আরেক বাংলাদেশিও আহত হয়ে ওই ক্যাম্পে এসেছেন। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয় না। উল্টো আহত অবস্থাতেই আবার যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সোহেলের স্ত্রী আকলিমা খাতুন বলেন, দেড় মাস পর যখন ভিডিওকলে তার চেহারা দেখলাম, বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। চুল-দাড়ি বড়, হাত ব্যান্ডেজ করা, কানে তুলা গোঁজা। একটা তাঁবুর ভেতর থেকে তিনি শুধু কাঁদছিলেন আর বলছিলেনÑ আমারে বাঁচাও। সোহেলের মা আনজিলা বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, আমি কিচ্ছু চাই না, শুধু আমার বাজানরে ফেরত চাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাত জোড় করে ভিক্ষা চাই, আমার পোলাডারে আমার কোলে এনে দেন। স্থানীয় বাসিন্দা আলাউদ্দিন খান, ইবাদ আলী শিকদারসহ কয়েকজন বলেন, দালালের প্রতারণার শিকার হয়ে সোহেলের পরিবার এখন চরম বিপর্যয়ের মধ্যে আছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় তার অনুপস্থিতিতে পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়েছে। তারা সরকারের কাছে দ্রুত তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।

গোপালগঞ্জের ভুক্তভোগী পলাশ শেখের বাবা জামিল শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।  তারা কোনো সহযোগিতা তো করেইনি, উল্টো ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। তার দাবি, চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানির চাকরি দেওয়ার কথা ছিল। তা সম্ভব না হলে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার কথা।  বোয়ালমারীর আবদুল হক বলেন, সোহেলের সঙ্গে তার ভাতিজা আকাশসহ বোয়ালমারীর আরও কয়েকজনের যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা যাননি। শুধু তার ছেলেকেই ৩০ জনের দলে পাঠানো হয়। পরিবারকে জানানো হয়েছিল, দুই বছরের জন্য কোম্পানির চাকরিতে যাচ্ছে। কিন্তু দেড় মাস পর ফোনে জানতে পারেন, তাদের ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে তার ছেলে আহত অবস্থায় একটি অস্থায়ী চিকিৎসাশিবিরে আছেন। তিনি দ্রুত ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।

এসব বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস জানান, বিষয়টি তার জানা ছিল না। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আইনি পদক্ষেপ নিলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!