পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার পর আবারও কূটনৈতিক পথে ফিরছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধে নীতিগত সম্মতির পাশাপাশি বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কাতারের রাজধানী দোহায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও বৈঠক নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে ফের ইরানের কঠোর অবস্থানের কারণেই মূলত পিছু হটেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে যে কারণেই এমনটা হোক না কেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত এড়াতে আলোচনাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
মার্কিন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আপাতত সব ধরনের সামরিক অভিযান স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে উভয় পক্ষই সংযম প্রদর্শনের বিষয়ে আগ্রহী। তাদের দাবি, যুদ্ধবিরতির ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত সমঝোতার বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নের বিষয়গুলো কারিগরি পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া হবে।
তবে ইরানের অবস্থান তুলনামূলক সতর্ক। দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো কারিগরি বৈঠকের আনুষ্ঠানিক সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়নি। সাম্প্রতিক মার্কিন হামলা এবং সমঝোতার শর্ত পূরণ না হওয়ার অভিযোগ তুলে তেহরান বলেছে, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ছাড়া আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব নয়।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের অনুরোধেই দোহায় নতুন বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
হরমুজ ঘিরেই মূল বিরোধ : বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ইরানের দাবি, প্রণালির নিরাপত্তা ও নৌযান চলাচল পরিচালনার দায়িত্ব মূলত তাদের। এ বিষয়ে বাইরের কোনো হস্তক্ষেপকে তারা সমঝোতা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌপথ হওয়ায় কোনো দেশ একতরফাভাবে সেখানে জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে বা টোল আরোপ করতে পারে না। ফলে এই ব্যাখ্যাগত পার্থক্যই নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বৈঠক করেছে ইরান। দুই দেশের প্রতিনিধিরা প্রণালির বর্তমান সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে তেহরান জানিয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পরও উত্তেজনা : কয়েক দিন আগে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালালে জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করে ইরান।
দুই দেশই একে অপরকে যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ আলোচনায় ফেরার আগ্রহ দেখানোয় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
তেলের বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা : হরমুজ প্রণালির উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে। সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার পর বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তেলের দামে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় লাগলে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বড় মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হবে। যদিও আলোচনার উদ্যোগের খবরে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে, কিন্তু পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।
এদিকে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি দীর্ঘ বিরতির পর রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে আবার তেল রপ্তানি শুরু করেছে। তবে একই এলাকায় কোম্পানির একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ১৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ এখনো জানা যায়নি।
নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ইঙ্গিত : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দাবি করেছেন, শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কাতারে আটকে থাকা ১২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দেশটির তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়েও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং এখন সরকার পুনর্গঠন ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু করেছে। একই সঙ্গে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘোষিত নীতির বাইরে যাবে না।
বাহরাইনকে কড়া সতর্কবার্তা : ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা আলী আকবর বেলায়াতি বাহরাইনকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, উসকানিমূলক কোনো পদক্ষেপ নিলে তেহরান আরও কঠোর জবাব দেবে। সম্প্রতি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার পর বাহরাইন ইরানের বিরুদ্ধে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। জবাবে ইরান দাবি করে, তাদের ভূখ-ে হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলো ব্যবহৃত হয়েছে।
কূটনীতিই একমাত্র ভরসা : বিশ্লেষকদের মতে, দোহার সম্ভাব্য বৈঠক সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে আসবে। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, সমঝোতার শর্ত বাস্তবায়ন এবং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে। তার পরও কয়েক দিনের সামরিক উত্তেজনার পর দুই দেশের আলোচনায় ফেরার আগ্রহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য ইতিবাচক বার্তা। কারণ হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনের কূটনৈতিক অগ্রগতি তাই নির্ধারণ করবে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নেবে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধানের পথে এগোবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন