বরিশালের আগৈলঝাড়ায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে বাস্তবায়নাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সংস্কারকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কাজ শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় হাতের স্পর্শেই সড়কের কার্পেটিং উঠে যেতে শুরু করায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। নি¤œমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, প্রকৌশলগত নিয়ম অনুসরণ না করা এবং বৃষ্টির মধ্যে তড়িঘড়ি করে কাজ সম্পন্নের কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার মাহিলাড়া-আম্বুলা-ছয়গ্রাম-পয়সারহাট সড়কের বাগধা ইউনিয়নের তালবাড়ী এলাকার ৫৪০ মিটার সড়ক সংস্কারের জন্য ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ২৪ লাখ ৫৯ হাজার ৮০০ টাকা ব্যয় ধরা হয়। দরপত্রের মাধ্যমে পার্শবর্তী বাবুগঞ্জ উপজেলার মীরগঞ্জ এলাকার মো. আসাদুজ্জামানের মালিকানাধীন ‘মেসার্স সরদার ট্রেডিং’ কাজটি পায়। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে কাজটি স্থানীয়ভাবে হাতবদল হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টরা কোনো ধরনের নিয়ম না মেনেই কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ করেছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, কাজ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিংয়ের বড় বড় অংশ উঠে গেছে। কোথাও কোথাও হাত দিয়ে টান দিলেই পিচ ও পাথরের আস্তরণ অনায়াসে উঠে আসছে। এটি উন্নয়নমূলক কাজের নামে চরম বিদ্রুপ বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
ভ্যানচালক আহসান ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার উন্নয়নের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। কিন্তু কিছু অসাধু ঠিকাদার ও দায়িত্বহীন কর্মকর্তার যোগসাজশে সেই উন্নয়নের সুফল আমরা পাচ্ছি না। কাজ যদি সঠিকভাবে হতো, তাহলে তিন দিনে রাস্তা এভাবে উঠে যেত না। আমাদের এখন এই বেহাল রাস্তা দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে। প্রতিদিন ভাঙা রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে আমাদের কষ্ট আরও বাড়ছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা রহিম হাওলাদার অভিযোগ করেন, ‘বৃষ্টির সময় আমরা তাদের কাজ করতে নিষেধ করেছিলাম। আমরা বলেছি, এই বৃষ্টিতে পিচ ঢাললে কোনো লাভ হবে না। কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথাই শোনেনি। কার্পেটিংয়ের আগে রাস্তাটি যথাযথভাবে পরিষ্কারও করা হয়নি। ময়লা ও ধুলোবালুর ওপরই তারা পিচ ঢেলে দিয়েছে। বিটুমিন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ব্যাপক কৃপণতা করা হয়েছে। এতে করে রাস্তার স্থায়িত্ব একেবারেই কমে গেছে।’
কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা জাকির মোল্লা নামের একজন জানান, ‘বৃষ্টির সময় এক গাড়ি মাল (কার্পেটিং) আনা হয়েছিল। আমি তখন কাজ না করার পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু এলজিইডির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তাদের নির্দেশেই কাজ শেষ করা হয়েছে। এখন সমস্যা দেখা দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।’
স্থানীয়রা জানান, জনগণের করের টাকার এই অপচয় কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে, নি¤œমানের কাজ অপসারণ করে নতুন করে মানসম্মত সংস্কারকাজ সম্পন্নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।
এ বিষয়ে উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমি কাজ শুরু করিয়ে সেখান থেকে চলে এসেছি। পরে কী হয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে যেখানে কার্পেটিং উঠে গেছে, সেখানে পুনরায় কাজ করে সমস্যার কারণ খতিয়ে দেখা হবে।’
উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী রবীন্দ্র চক্রবর্তী অনিয়মের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘কাজে অনিয়মের অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তের জন্য বরিশাল এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শনে আসবেন। এখন পর্যন্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো বিল পরিশোধ করা হয়নি। অনিয়মের প্রমাণ মিললে এবং ত্রুটি সংশোধন না করা হলে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন