দেশের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ও প্রতিবন্ধী নাগরিকদের সেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে বড় ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তিনি জানান, প্রতিটি প্রতিবন্ধী নাগরিকের জন্য খোলা হবে ‘আলাদা ফাইল’, নিশ্চিত হবে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন। হুইলচেয়ার নিয়ে সহজে ওঠা যাবে ইভি বাসে। প্রতিবন্ধীবান্ধব হচ্ছে দেশের ৫০০ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিবন্ধী শিশুদের স্কুলে ফেরাতে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণেরও পরিকল্পনা করেছে সরকার।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও সেবা নিশ্চিতকরণ এবং বাস্তবায়ন কমিটির দ্বিতীয় ফলোআপ সভাশেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। উল্লেখ্য, এই প্রক্রিয়ার নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল স্টিয়ারিং কমিটির সভাপতি হিসেবে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী এবং সদস্যসচিব হিসেবে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব। সভায় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ছাড়াও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এরই মধ্যে ঢাকার কড়াইল বস্তিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘শিশুস্বর্গ’ নামক একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান নিজে উপস্থিত থেকে এই মানবিক কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এই কর্মসূচির মাধ্যমে কড়াইল বস্তির প্রায় এক হাজার প্রতিবন্ধী শিশুকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছর থেকেই এই কার্যক্রমকে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দেশের ২০ থেকে ২৫টি উপজেলায় ‘শিশুস্বর্গ’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী শিশুদের আর্লি ডিটেকশন (প্রাথমিক শনাক্তকরণ), রেফারাল ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. মুহিত আরও জানান, নতুন নির্মিতব্য ৫০০টি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিবন্ধীদের যাতায়াতের জন্য র্যাম্প, লিফট এবং অন্তত একটি বিশেষ টয়লেটের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো প্রকল্প মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সেটি ‘ডিস্যাবিলিটি ইনক্লুসিভ’ (প্রতিবন্ধীবান্ধব) কিনা, তা কড়াভাবে যাচাই করা হবে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে পরিবেশবান্ধব ও বিদ্যুৎচালিত ইভি বাস চালুর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানেও প্রতিবন্ধীদের সুবিধার কথা ভাবা হচ্ছে। ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে চালু হতে যাওয়া ইভি বাসগুলোতে যেন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীরা সহজে উঠতে ও যাতায়াত করতে পারেন, সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী ড. মুহিত জানান, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নতুন উদ্যোগে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করতে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এ একটি আলাদা সেগমেন্ট রাখা হচ্ছে। স্পেশাল অলিম্পিক ও প্যারা অলিম্পিকে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনা সফল প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের এরই মধ্যে এক লাখ টাকা করে অনুদান ও সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে এবং এই ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যের শেষে জোর দিয়ে বলেন, আমরা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের বিষয়গুলোকে কেবল ‘চাহিদা’ হিসেবে দেখছি না, বরং এগুলো তাদের ‘অধিকার’। প্রতিটি মন্ত্রণালয় অন্য সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে, যেন আমরা একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পারি।
এ সময় সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল জানান, প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা চ্যারিটি নয়। একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে তার নাগরিকদের যে সামাজিক চুক্তি থাকে, সেই চুক্তি অনুযায়ী একজন নাগরিক হিসেবে এটি তাদের প্রাপ্য অধিকার। আমরা সেই অধিকার সুনিশ্চিত করার কাজ করছি।
সভায় স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ^াসসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন