বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ফুটবলপ্রেমীদের নজর এখন আর্জেন্টিনা ও কেপ ভার্দের লড়াইয়ে। কাগজে-কলমে এটি চলতি আসরের সবচেয়ে বড় অসম ম্যাচগুলোর একটি। একদিকে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও বর্তমান শিরোপাধারী আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে আসা কেপ ভার্দে।
বাংলাদেশ সময় আজ শনিবার ভোররাত ৪টায় মিয়ামি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি দুই দল। ম্যাচটির সবচেয়ে আলোচিত দ্বৈরথ হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি ও কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সি গোলরক্ষক ভোজিনহার মধ্যে। তিন সপ্তাহ আগেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রায় অচেনা এই গোলরক্ষক এখন বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত নাম।
রূপকথা লিখে নকআউটে কেপ ভার্দে : বিশ্বকাপে অভিষেকেই ইতিহাস গড়েছে আফ্রিকার ছোট্ট দেশ কেপ ভার্দে। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে সবাইকে চমকে দেয় তারা। এরপর দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের সঙ্গেও ড্র করে গ্রুপের দ্বিতীয় দল হিসেবে শেষ ৩২ নিশ্চিত করে। বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচ না জিতেই নকআউটে ওঠার এই কীর্তি ফুটবলবিশ্বে অন্যতম বড় চমক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইতিহাস-ঐতিহ্যে দুই মেরুর দুই দল : আর্জেন্টিনা ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপেই রানার্সআপ হয়েছিল। ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২ সালে জিতেছে বিশ্বকাপ। শুধু ১৯৭০ সালের আসরে তারা খেলতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে তিনটি বিশ্বকাপ থেকে অবশ্য তারা সরে দাঁড়িয়েছিল।
কোপা আমেরিকাও জিতেছে রেকর্ড ১৬ বার, যার মধ্যে সর্বশেষ দুটি শিরোপাও তাদের। ২০২২ সালের মার্চ থেকে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ তিনের বাইরে যায়নি আর্জেন্টিনা। গত বছর পর্যন্ত টানা দুই বছর ছিল এক নম্বরে।
অন্যদিকে কেপ ভার্দের ফুটবল ফেডারেশন গঠিত হয় ১৯৮২ সালে। ১৯৮৬ সালে ফিফার সদস্যপদ পায় দেশটি, যে বছর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। ২০০২ সালে প্রথম বিশ্বকাপ বাছাইয়ে অংশ নেয় কেপ ভার্দে। ২০২২ বিশ্বকাপের আগে কখনোই তাদের বাস্তবসম্মত সুযোগ তৈরি হয়নি। চার বছর আগে শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়ার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করায় কাতার বিশ্বকাপের টিকিট হাতছাড়া হয়।
২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আটবারের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণকারী ক্যামেরুন থাকা গ্রুপে মাত্র এক হারে ১০ ম্যাচ শেষে শীর্ষস্থান দখল করে মূল পর্বে জায়গা করে নেয় তারা।
ছোট দেশ, বড় স্বপ্ন : ২০১৩ সালে প্রথমবার আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে (আফকন) অংশ নেয় কেপ ভার্দে। অভিষেকেই কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। ২০২৩ সালেও শেষ আটে খেললেও ২০২৫ আফকনে জায়গা করে নিতে পারেনি। ২০০৬ সালে প্রথমবার ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০-তে উঠে আসে দেশটি। ২০১৪ সালে সর্বোচ্চ ২৭তম স্থানে ওঠার পর গত ৯ বছর ধরে ৬০ থেকে ৮০-এর মধ্যে অবস্থান করছে। বর্তমানে তাদের র্যাঙ্কিং ৬৪।
প্রবাসী ফুটবলারদের ওপর নির্ভরতা : ২০১০ সালে কোচ জোয়াও দে দেউস বিদেশে জন্ম নেওয়া কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের দলে অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকেই বদলে যেতে শুরু করে দলটির চেহারা। বর্তমান দলে ১২ জনের জন্ম কেপ ভার্দেতে। উরুগুয়ের বিপক্ষে দলের প্রথম বিশ্বকাপ গোলদাতা কেভিন পিনা রাজধানী প্রাইয়ার সন্তান। তবে নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া পাঁচজন, ফ্রান্সে তিনজন এবং পর্তুগালে জন্ম নেওয়া তিনজন ফুটবলার রয়েছেন দলে। তাদের কেউই দেশের ঘরোয়া লিগে খেলেন না। ২৩ জন খেলেন ইউরোপে। তবে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে খেলেন শুধু ভিয়ারিয়ালের ডিফেন্ডার লোগান কস্তা। গোলরক্ষক ভোজিনহা সম্প্রতি পর্তুগিজ দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব শাভেসের সঙ্গে চুক্তি শেষ করে বর্তমানে ফ্রি এজেন্ট। দলের সাতজন খেলোয়াড় পর্তুগালে খেললেও বড় ক্লাবে আছেন শুধু ফুল-ব্যাক সিডনি লোপেস কাবরাল, যিনি বেনফিকা ছেড়ে ট্রাবজোনস্পোরে যোগ দিচ্ছেন।
দামেই বোঝা যায় পার্থক্য : ট্রান্সফার মার্কটের তথ্য অনুযায়ী, কেপ ভার্দের পুরো স্কোয়াডের বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৬৮ লাখ পাউন্ড। বিশ্বকাপের ৪৮ দলের মধ্যে মাত্র ৯টি দলের মূল্য এর চেয়ে কম। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার স্কোয়াডের মূল্য প্রায় ৬৯ কোটি ৩৭ লাখ পাউন্ড, যা টুর্নামেন্টে সপ্তম সর্বোচ্চ। তালিকার শীর্ষে রয়েছে ফ্রান্স।
আর্জেন্টিনার প্রথম একাদশের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৩৬ কোটি পাউন্ড, যেখানে সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় চেলসির মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ। অন্যদিকে পুরো কেপ ভার্দে দলের মূল্যই প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ পাউন্ড। তাদের সবচেয়ে দামি ফুটবলার ট্রাবজোনস্পোরের ওয়াগনার পিনা। তবে বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তিনি মাত্র এক ম্যাচ খেলেছেন। হিসাব অনুসারে, আর্জেন্টিনার পাঁচজন খেলোয়াড়ের বাজারমূল্যই কেপ ভার্দের পুরো দলের চেয়ে বেশি।
অভিজ্ঞতায়ও যোজন যোজন ব্যবধান : আর্জেন্টিনা দলে রয়েছেন ১৬ জন বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন লিগ এবং কাপ মিলিয়ে অসংখ্য শিরোপা জিতেছেন তারা। অন্যদিকে কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের সাফল্য সীমিত সাইপ্রাস, হাঙ্গেরি, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের শিরোপার মধ্যে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন জোভানে কাবরালের, যিনি ২০২০-২১ মৌসুমে স্পোর্টিং সিপির হয়ে পর্তুগিজ লিগ জিতেছিলেন। কেভিন পিনা ২০২৪-২৫ মৌসুমে ক্রাসনোদারের হয়ে রাশিয়ান প্রিমিয়ার লিগ জেতেন।
দুই দেশের পার্থক্য শুধু ফুটবলে নয় : আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে ১০টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত কেপ ভার্দে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পনেরো শতকে পর্তুগিজরা সেখানে বসতি স্থাপনের আগে দ্বীপগুলো জনশূন্য ছিল। দীর্ঘ সময় এটি দাস ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। ১৯৭৫ সালে পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে দেশটি।
মাত্র ৪ হাজার ৩৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশের জনসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার। বিশ্বকাপে খেলা দেশগুলোর মধ্যে এটি তৃতীয় ক্ষুদ্রতম এবং নকআউট পর্বে ওঠা সবচেয়ে ছোট দেশ।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ এবং আয়তন ২৮ লাখ বর্গকিলোমিটার। এটি বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম এবং দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ৬৮৩ বিলিয়ন ডলার, যেখানে কেপ ভার্দের জিডিপি মাত্র ৩ বিলিয়ন ডলার।
সব পরিসংখ্যানই আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখলেও বিশ্বকাপে রূপকথা লিখে আসা কেপ ভার্দে আরেকটি অঘটনের স্বপ্ন নিয়েই মাঠে নামবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন