ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্য উপলক্ষে রাজধানী তেহরানে বইছে লাখো শোকার্ত মানুষের ¯্রােত। কয়েক দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার শুরু হয়েছে তার শেষযাত্রার প্রধান শোকমিছিল। ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, এটি আধুনিক ইরানের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগম।
এদিন ভোর থেকেই তেহরানের প্রধান সড়কগুলোতে মানুষের ঢল নামে। জাতীয় পতাকায় মোড়ানো খামেনির কফিনের সঙ্গে রাখা হয় একই হামলায় নিহত তার পরিবারের সদস্যদের কফিনও। শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া বহু মানুষ কফিন স্পর্শের চেষ্টা করেন, আবার অনেকে নিজেদের ওড়না ও ব্যক্তিগত সামগ্রী কফিনের সংস্পর্শে এনে আশীর্বাদ লাভের প্রত্যাশা করেন।
রাষ্ট্রীয় আয়োজনে রাজধানীর প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে শোকমিছিল এগিয়ে চলে। বিপুল জনসমাগমের কারণে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। ভিড় নিয়ন্ত্রণে দমকলকর্মীরা মানুষের ওপর পানি ছিটান এবং পদদলিত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে বারবার সতর্কবার্তা প্রচার করা হয়। শেষযাত্রা উপলক্ষে রাজধানীর আকাশসীমাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
শোকানুষ্ঠানের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল লাল পতাকা প্রদর্শন। এই পতাকায় লেখা ছিল, ‘হে হোসেনের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা।’ শিয়া ঐতিহ্যে এই লাল পতাকা অন্যায়ভাবে নিহত ব্যক্তির রক্তের বিচার ও প্রতিশোধের অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। শোকমিছিলে অংশ নেওয়া মানুষের কণ্ঠে বারবার ধ্বনিত হয় প্রতিশোধের স্লোগান। অনেকের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা, খামেনির প্রতিকৃতি এবং বিভিন্ন প্রতীকী ব্যানার।
শোকযাত্রার বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পতাকা পোড়ানোর ঘটনাও ঘটে। কিছু বিক্ষোভকারী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। শোকাহত বহু মানুষের বক্তব্য, খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে এবং এই ঘটনা কোনোভাবেই ভোলা যাবে না।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যেরও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, জানাজায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব একত্রিত হওয়ায় সামরিকভাবে তাদের লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব ছিল। এর জবাবে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, মানুষকে হত্যা করা গেলেও আদর্শকে হত্যা করা যায় না এবং ইরানের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
শোকানুষ্ঠানকে ঘিরে কেবল আবেগ নয়, কূটনৈতিক বার্তাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে ইরান। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানানোর সময় ভিন্ন ভিন্ন কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রতিটি আয়াতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশ বা গোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ও অবস্থান প্রতীকীভাবে প্রকাশের চেষ্টা করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ গোষ্ঠী, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন এবং ইরাকের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের সামনে শাহাদাত, অঙ্গীকার ও বিজয় সম্পর্কিত আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, ভারত ও মিশরের প্রতিনিধিদের জন্য তুলনামূলক শান্ত ও আশ্বাসমূলক আয়াত নির্বাচন করা হয়। যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখা পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের জন্য বিশেষ দোয়া পাঠ করা হয়।
সৌদি আরবের প্রতিনিধিদল উপস্থিত থাকলেও তাদের জন্য নির্বাচিত আয়াত নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একদিকে ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের স্মরণ, অন্যদিকে সমসাময়িক আঞ্চলিক রাজনীতিরও প্রতীকী ইঙ্গিত বহন করে।
ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, রাজধানীর মেট্রো ব্যবস্থায় শেষকৃত্য উপলক্ষে দুই দিনে ৭০ লাখের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেছেন, যা নতুন রেকর্ড। বিপুল জনসমাগম সামাল দিতে স্বেচ্ছাসেবীরা বিনা মূল্যে পানি, শরবত, চা ও খাদ্য বিতরণ করেন। তরুণ-তরুণীদের বড় একটি অংশ শোকানুষ্ঠানের বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমে অংশ নেন।
রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি অনুযায়ী, তেহরানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে খামেনির মরদেহ পবিত্র শহর কুমে নেওয়া হবে। এরপর ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় জানাজা এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সবশেষ তার জন্মস্থান মাশহাদে ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হবে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, শেষকৃত্য কেবল একজন নেতাকে বিদায় জানানোর অনুষ্ঠান নয়; এটি জাতীয় ঐক্য, প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্রীয় দৃঢ়তারও প্রতীক। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, এই আয়োজনের মাধ্যমে তেহরান দেশীয় জনমতকে সংহত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছে।
খামেনির শেষবিদায়কে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একদিকে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান, অন্যদিকে প্রতিশোধের অঙ্গীকার, যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান এবং কূটনৈতিক প্রতীক ব্যবহারের ফলে এই আয়োজন শুধু একটি শেষকৃত্য নয়, বরং আঞ্চলিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়েও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন