× UCB Sticker Card
বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আমানুর রহমান, শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ,

প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০৭:২৫ এএম

বর্ষায় হাওর বাঁচাতে বৃক্ষশক্তি

আমানুর রহমান, শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ,

প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০৭:২৫ এএম

বর্ষায় হাওর বাঁচাতে বৃক্ষশক্তি

বর্ষার হাওর অদ্ভুত সৌন্দর্যের আধার হলেও এর ভয়াল রূপ সেখানকার মানুষের জন্য এক নিয়মিত আতঙ্ক। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বিস্তীর্ণ এই হাওরাঞ্চল প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৪ শতাংশ। মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত বর্ষার পানিতে পুরো এলাকাটি এক বিশাল সাগরে পরিণত হয়। এ সময় চারপাশের থইথই পানির মাঝে ছোট ছোট গ্রামকে একেকটি ভাসমান দ্বীপ বলে মনে হয়। তবে পানির তীব্র তোড় আর ঢেউয়ের আঘাতে এসব দ্বীপ প্রতিনিয়ত অস্তিত্ব-সংকটে ভোগে। বছরের পর বছর ধরে কোটি টাকার বাঁধ নির্মাণ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা টেকসই হয় না। প্রকৃতির এই প্রবল শক্তির সামনে মানুষের তৈরি কৃত্রিম প্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন বারবার হার মানে, তখন হাওরকে বাঁচাতে সবচেয়ে কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয় প্রকৃতিরই এক অসামান্য দানÑ বৃক্ষশক্তি।

হাওরের বর্ষাকালীন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ‘আফাল’, যা মূলত প্রবল বাতাসে সৃষ্ট বিশাল ও ধ্বংসাত্মক ঢেউ। বর্ষায় উন্মুক্ত হাওরে বাতাসের বেগ যখন ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটারে পৌঁছায়, তখন চার-পাঁচ ফুট উঁচু দানবীয় ঢেউ আছড়ে পড়ে গ্রামগুলোর ওপর। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই আফালের কারণে প্রতিবছর হাওরাঞ্চলের শত শত গ্রাম ভাঙনের মুখে পড়ে এবং হাজার হাজার একর ফসলি জমি ও বসতভিটা জলে বিলীন হয়। ঢেউয়ের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য হাওরবাসী বাঁশ, বস্তা বা ইট-পাথরের দেয়াল তৈরি করলেও পানির প্রবল শক্তির কাছে তা সহজেই হার মানে। ক্রমাগত ভূমিক্ষয় ও বাস্তুচ্যুতি কেবল হাওরবাসীর অর্থনৈতিক মেরুদ-ই ভেঙে দিচ্ছে না, বরং সেখানকার জীবনযাত্রাকে করে তুলেছে চরম অনিশ্চিত। এমন পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বাঁধের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিকভাবে অভিযোজিত একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী প্রাচীর গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

আফালের এই ধ্বংসলীলা রুখতে হিজল, করচ ও বরুণের মতো জলাবনের বৃক্ষগুলো অদ্বিতীয় বর্ম হিসেবে কাজ করে। এই বিশেষ প্রজাতির গাছগুলো বছরের প্রায় ছয় মাস পানির নিচে তলিয়ে থাকলেও অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ করচ বা হিজলগাছ তার জালের মতো বিস্তৃত শিকড় দিয়ে প্রায় দশ মিটার ব্যাসার্ধের মাটিকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে রাখে। আফালের বিশাল ঢেউ যখন এই গাছগুলোর ওপর আছড়ে পড়ে, তখন এদের ডালপালা ও কা- প্রাকৃতিক ‘ব্রেকওয়াটার’ বা ঢেউ-নিরোধক হিসেবে কাজ করে ঢেউয়ের শক্তিকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। ফলে ঢেউ যখন লোকালয়ে বা মাটির বাঁধে আঘাত করে, তখন তার আর ভাঙন ধরানোর মতো ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা থাকে না। প্রকৃতির এই রক্ষাকবচগুলো কেবল মাটিই ধরে রাখে না, বরং মাটির বাঁধের স্থায়িত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে হাওরের গ্রামগুলোকে নিরাপদে আগলে রাখে।

বৃক্ষরাজি কেবল হাওরের গ্রামগুলোকেই রক্ষা করে না, বরং এগুলো পুরো হাওরের বাস্তুতন্ত্রের প্রাণভোমরা হিসেবেও কাজ করে। হিজল-করচের বন হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অসামান্য ভূমিকা পালন করে। বর্ষায় যখন চারদিক পানিতে তলিয়ে যায়, তখন এসব গাছের পাতা ও ডালপালা স্থানীয় মাছের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও প্রজননক্ষেত্র হয়ে ওঠে। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃক্ষসমৃদ্ধ হাওর এলাকায় মাছের উৎপাদন সাধারণ এলাকার চেয়ে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি হয়। কারণ, গাছের পচা পাতা থেকে পানিতে প্রচুর পরিমাণে ফাইটোপ্লাঙ্কটন বা মাছের প্রাকৃতিক খাবার তৈরি হয়। এ ছাড়া হাওরের এই বনভূমি প্রায় ২৫০ প্রজাতির দেশি ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাস। একদিকে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, অন্যদিকে জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের জোগান দিয়ে এই বৃক্ষগুলো হাওরবাসীর অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখতে নীরব কিন্তু জোরালো অবদান রাখছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে নির্বিচার বৃক্ষনিধন ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে হাওরের এই প্রাকৃতিক বর্ম আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। পরিসংখ্যান বলছে, গত ৫০ বছরে হাওরাঞ্চল তার আদি জলাবনের প্রায় ৬০ শতাংশেরও বেশি হারিয়েছে, যার খেসারত হিসেবে প্রতিবছর ভয়াবহ বন্যা ও ভাঙনের শিকার হতে হচ্ছে। হাওরকে বাঁচাতে হলে এখনই হাওরের চারপাশে, সড়কের দুই পাশে এবং দ্বীপসদৃশ গ্রামগুলোর সীমানায় পরিকল্পিতভাবে হিজল ও করচের বিশাল ‘সবুজ বেষ্টনী’ গড়ে তুলতে হবে। এজন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। হাওরের এই অপরূপ প্রকৃতি ও মানুষের জীবনধারাকে টিকিয়ে রাখতে বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। বৃক্ষশক্তিকে কাজে লাগিয়েই আমরা হাওরকে এক স্থায়ী, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারি।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!