× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

কাজী আহমেদ শামীম, লেখক, বিশ্লেষক

প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ০৭:২২ এএম

বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর ও ভূ-কৌশলগত বাস্তবতা

কাজী আহমেদ শামীম, লেখক, বিশ্লেষক

প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ০৭:২২ এএম

বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর ও ভূ-কৌশলগত বাস্তবতা

চীনের বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চার দিনের দ্বিপক্ষীয় সফরের সমাপনী লগ্নে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক খবর সামনে এসেছে। বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর’ (ইগঈঊঈ) গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও রোহিঙ্গা সংকটে চীনের মধ্যস্থতার প্রতিশ্রুতি এসেছে। প্রথম দেখায় এটিকে একটি দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় অর্থনৈতিক পরিকাঠামো মনে হলেও, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক কাঠামো এবং ভূ-রাজনীতির গভীর অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ফেললে এর পেছনে এক বিশাল কৌশলগত বিষয়াদি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডরের ধারণা হঠাৎ করে আবির্ভূত হয়নি; বরং এটি দীর্ঘদিনের একটি আঞ্চলিক সংযোগ উদ্যোগের নতুন সংস্করণ। এর সূচনা হয় ১৯৯৯ সালে চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত কুংমিং ইনিসিয়াটিভের মাধ্যমে। সে সময় বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারের নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা একটি অভিন্ন অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলার ধারণা উত্থাপন করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সড়ক, রেল, জ্বালানি, বন্দর এবং বাণিজ্যিক সংযোগকে একীভূত করা। এই উদ্যোগ পরবর্তীতে ইঈওগ (ইধহমষধফবংয–ঈযরহধ–ওহফরধ–গুধহসধৎ) ঋড়ৎঁস ভড়ৎ জবমরড়হধষ ঈড়ড়ঢ়বৎধঃরড়হ-এ রূপ নেয় এবং ২০০০-এর দশকে ধারাবাহিক সংলাপ, গবেষণা ও নীতিগত আলোচনার মাধ্যমে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করে। ২০১৩ সালে চীনের ইবষঃ ধহফ জড়ধফ ওহরঃরধঃরাব (ইজও) ঘোষণার পর ইঈওগ-কে সম্ভাব্য ছয়টি অর্থনৈতিক করিডরের অন্যতম একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সে সময় অনেকেই মনে করেছিলেন, ইঈওগ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক ভূগোল পাল্টে দিতে পারে। কিন্তু ভূ-রাজনীতি অর্থনীতির চেয়ে অনেক সময় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ভারত ধীরে ধীরে উপলব্ধি করে যে ইঈওগ করিডর চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতিকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একেবারে সন্নিকটে নিয়ে আসতে পারে। একই সময়ে ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধ, ডোকলাম সংকট (২০১৭), গালওয়ান সংঘর্ষ (২০২০) এবং ইন্দো-প্যাসিফিক  অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে ভারত ইবষঃ ধহফ জড়ধফ ওহরঃরধঃরাব থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয় এবং ইঈওগ কার্যত নীতিগত অগ্রাধিকার হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনার চেয়ে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ শেষ পর্যন্ত অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে ইগঈঊঈ-কে ইঈওগ-এর একটি কৌশলগত পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা যেতে পারে।

ভারতের পরিবর্তে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে কেন্দ্র করে অপেক্ষাকৃত ছোট কিন্তু অধিক বাস্তবায়নযোগ্য একটি করিডর গড়ে তোলার মাধ্যমে চীন একদিকে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের বিকল্প পথ নিশ্চিত করতে চায়, অন্যদিকে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চল এবং বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে একটি নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে আগ্রহী। অর্থাৎ, ইঈওগ যেখানে চার দেশের রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল, ইগঈঊঈ সেখানে তুলনামূলকভাবে সীমিত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়নের সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে।

ইগঈঊঈ গঠনের বেশ কিছু বাস্তবতা রয়েছে। চীনের এই করিডোর প্রস্তাবটি মূলত বেইজিংয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় সুসংহত করার একটি বাস্তববাদী প্রয়াস। দীর্ঘদিন ধরে চীন ‘মালাক্কা ডিনোমক একটি স্ট্র্যাটেজিক দুর্বলতায় ভুগছে। চীনের ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানিকৃত জ্বালানি ও বাণিজ্য পরিবাহিত হয় সংকীর্ণ মালাক্কা প্রণালি হয়ে, যা যেকোনো আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের দ্বারা অবরুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এই করিডরটি বাস্তবায়িত হলে চীন মিয়ানমার ও বাংলাদেশ হয়ে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের জলরাশিতে প্রবেশাধিকার পাবে। ফলে, মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বেইজিং এক অভূতপূর্ব কৌশলগত স্বস্তি লাভ করবে।

তবে এই করিডরের কেবল একটি বাস্তববাদী বা নিরাপত্তা কেন্দ্রিক রূপ আছে তা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘ইন্টারডিপেন্ডেন্স লিবারেলিজম’ বা পারস্পরিক নির্ভরশীলতার উদারপন্থি তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিকভাবে একে অপরের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তাদের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা হ্রাস পায় এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। চীন এই অর্থনৈতিক করিডরকে সেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং রাখাইন রাজ্যের অস্থিতিশীলতা চীনের বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। চীন খুব ভালো করেই জানে, মিয়ানমারে শান্তি না থাকলে তাদের এই করিডর আলোর মুখ দেখবে না।

তবে এই মহাপরিকল্পনার উজ্জ্বল আলোর পাশাপাশি কিছু দীর্ঘ ছায়াও রয়েছে। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি হলোÑ ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’। চীন যখন এই করিডরের প্রস্তাব দিচ্ছে, তখন ওয়াশিংটন, দিল্লি কিংবা টোকিও গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। বাংলাদেশ যদি কোনো একটি ব্লকের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে, তবে তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্যের কূটনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তা ছাড়া, মিয়ানমারের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর। একটি অস্থিতিশীল দেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট রুট তৈরি করা এবং বিশাল অংকের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক টেকসই যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন, যাতে দীর্ঘমেয়াদে এটি কোনো ‘ঋণের ফাঁদ’ বা হোয়াইট এলিফ্যান্টে পরিণত না হয়।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিদ্যমান আঞ্চলিক সহযোগিতা ব্যবস্থার ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের স্থবির আঞ্চলিক সংস্থা সার্ক (এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব অর্জনকারী বিমসটেকের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে। সার্ক দীর্ঘদিন ধরে ভারত-পাকিস্তান রাজনৈতিক বিরোধের কারণে কার্যকর অর্থনৈতিক সংহতি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যদি বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক করিডর গড়ে ওঠে, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পরিবর্তে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রবণতা আরও জোরদার হতে পারে। অর্থাৎ, সার্কের পরিবর্তে কার্যকর অর্থনৈতিক সংযোগ নির্ভর করবে ছোট আকারের, স্বার্থভিত্তিক অংশীদারিত্বের ওপর।

অন্যদিকে, বিমসটেকের জন্য এটি একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই সৃষ্টি করবে। কারণ বিমসটেকের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলোÑ বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য, সংযোগ, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। যদি ইগঈঊঈ-কে বিমসটেকের গধংঃবৎ চষধহ ভড়ৎ ঞৎধহংঢ়ড়ৎঃ ঈড়হহবপঃরারঃু এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ, বন্দর ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয় করা যায়, তাহলে এটি পুরো অঞ্চলের সংযোগ ব্যবস্থাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি করিডরটি সম্পূর্ণভাবে চীনকেন্দ্রিক দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে বিমসটেকের প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব কিছুটা হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকিও থেকে যাবে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে কোনো একক ভূ-রাজনৈতিক বলয়ের অংশে পরিণত না হয়ে ‘ঙঢ়বহ জবমরড়হধষরংস’ বা উন্মুক্ত আঞ্চলিক সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করা। অর্থাৎ, ইগঈঊঈ, ইওগঝঞঊঈ, ঝঅঅজঈ, ওঙজঅ, অঝঊঅঘ এবং অন্যান্য সংযোগ উদ্যোগকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং পরিপূরক কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এতে বাংলাদেশ একদিকে চীনের বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে, অন্যদিকে ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হবে।

তবে ইগঈঊঈ-এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কেবল অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নয়। মিয়ানমারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাখাইন অঞ্চলের নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, বিনিয়োগের আর্থিক টেকসইতা এবং বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, এই পাঁচটি বিষয়ই করিডরটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে যে এই উদ্যোগটি বিমসটেক, এবং অন্যান্য আঞ্চলিক সংযোগ কাঠামোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়। তাহলেই ইগঈঊঈ কেবল একটি পরিবহন করিডরে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নব্য-বাস্তববাদ (ঘবড়-ৎবধষরংস)-এর আলোকে বলা যায়, যখন বৃহৎ বহুপাক্ষিক উদ্যোগ ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে অচল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই ছোট, অধিক কার্যকর এবং স্বার্থভিত্তিক আঞ্চলিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়। ইঈওগ থেকে ইগঈঊঈ-এ রূপান্তর সেই পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতারই একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!