বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নাটকীয় ম্যাচ, পাঁচ গোলের রোমাঞ্চ আর আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের আনন্দকে ছাপিয়ে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় ভিএআর। মিশরের বাতিল হওয়া গোল, মোহাম্মদ সালাহর না-পাওয়া পেনাল্টি এবং রেফারির একাধিক সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সাবেক রেফারি ও বিশ্লেষকদের মধ্যে যেমন মতভেদ তৈরি হয়েছে, তেমনি ম্যাচ পরিচালনায় অসন্তোষ জানিয়ে ফিফার কাছেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছে মিশর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। ফলে এই ম্যাচটি এখন শুধু একটি ফুটবল লড়াই নয়, বরং আধুনিক ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার ও রেফারিংয়ের সীমা নিয়ে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
বিতর্কের জন্ম যে গোল বাতিলে
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ আর্জেন্টিনা ও মিশরের ম্যাচ শেষ হয়েছে নাটকীয়তা, বিতর্ক এবং ভিএআরকে ঘিরে তুমুল আলোচনার মধ্য দিয়ে। ম্যাচের ফলাফলের চেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে মিশরের বাতিল হওয়া গোলটি। এক পক্ষের দাবি, ভিএআর তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে। অন্য পক্ষ বলছে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি সঠিক।
ম্যাচের ৫৮তম মিনিটে দ্রুতগতির এক পাল্টা
আক্রমণ থেকে মোস্তফা জিকো বল জালে জড়িয়ে মিশরকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। কিন্তু ভিএআরের পরামর্শে রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে গোলটি বাতিল করেন। কারণ, আক্রমণের শুরুতে মারওয়ান আতিয়া আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ে চাপ দিয়েছিলেন, যা ভিডিও পর্যালোচনায় ধরা পড়ে।
সমালোচকদের চোখে ভিএআরের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ
ফক্স স্পোর্টসের বিশ্লেষক ও ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক রব গ্রিন মনে করেন, এত দূরের একটি ঘটনার কারণে গোল বাতিল করা ভিএআরের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার মতে, মাঠের এক প্রান্তে ঘটে যাওয়া সামান্য সংস্পর্শকে কেন্দ্র করে আক্রমণের শেষ মুহূর্তের গোল বাতিল করা প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারকে নির্দেশ করে।
একই ধরনের মত দিয়েছেন সাবেক ফিফা রেফারি মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গও। তার ভাষায়, ঘটনাটি আদৌ ফাউল ছিল কি না, সেটিই প্রশ্নসাপেক্ষ। পাশাপাশি আক্রমণের শুরু থেকে গোল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় এবং একাধিক পাসের পর সেই ঘটনাকে গোলের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক হয়নি।
সালাহর পেনাল্টির দাবি কেন গ্রহণ করা হয়নি?
বিতর্ক আরও বাড়ে আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে মোহাম্মদ সালাহর পেনাল্টির আবেদন ঘিরে। অনেকের প্রশ্ন ছিল, জিকোর গোলের আগে ফাউল খুঁজে পাওয়া গেলে সালাহর ঘটনাটি কেন একইভাবে পর্যালোচনা করা হলো না?
এ বিষয়ে ক্ল্যাটেনবার্গের ব্যাখ্যা, পেনাল্টি দেওয়ার ক্ষেত্রে ভিএআরের মানদ- আরও কঠোর। পেনাল্টি দিতে হলে স্পষ্ট ও জোরালো প্রমাণ প্রয়োজন হয়। সেই মানদ- পূরণ না হওয়ায় রেফারির মূল সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়নি।
নিয়মের ব্যাখ্যায় ভিন্ন অবস্থান
ফক্স স্পোর্টসের রেফারিং বিশেষজ্ঞ ড. জো মাখনিক অবশ্য মনে করেন, গোল বাতিলের সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক ফুটবল আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার মতে, কোনো ফাউলের মাধ্যমে যদি আক্রমণকারী দল বলের দখল পায় এবং সেই একই ধারাবাহিক আক্রমণ থেকে গোল আসে, তাহলে ভিএআর গোল বাতিল করতে পারে। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, ভিএআর প্রটোকলে কোথাও উল্লেখ নেই যে ফাউলটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বা নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে ঘটতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ নতুন করে বলের দখল না পায় এবং একই আক্রমণের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, ততক্ষণ সেই ফাউল পর্যালোচনা করা সম্ভব।
রেফারির সিদ্ধান্তে ভিএআরের ভূমিকা
মাঠের রেফারি ঘটনাটি দেখেও কেন ফাউল দেননি এ প্রশ্নের জবাবে মাখনিক বলেন, রেফারির দৃষ্টিকোণ সব সময় সেরা নাও হতে পারে। ভিএআরের বিভিন্ন ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল এমন তথ্য সামনে আনতে পারে, যা মাঠে থাকা রেফারির পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে দেখা সম্ভব হয় না। তাই প্রযুক্তির উদ্দেশ্যই হলো স্পষ্ট ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি করা।
প্রযুক্তি বনাম ফুটবলের স্বাভাবিকতা
আর্জেন্টিনা মিসর ম্যাচের এই বিতর্ক আবারও দেখিয়ে দিল, ভিএআর ফুটবলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলেও এর প্রয়োগ নিয়ে মতভেদ থেকেই যাচ্ছে। একদল মনে করে প্রযুক্তি সঠিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করছে, অন্যদলের মতে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ ফুটবলের স্বাভাবিক গতি ও আবেগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে প্রতিটি সিদ্ধান্তই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। তাই ভিএআর নিয়ে বিতর্ক হয়তো সহজে শেষ হবে না। বরং প্রযুক্তি ও মানবিক ব্যাখ্যার এই টানাপোড়েনই আধুনিক ফুটবলের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছে মিশর
গতকালের খেলায় আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হারের পর ম্যাচ পরিচালনা নিয়ে ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দিয়েছে মিশর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে মঙ্গলবার এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
ম্যাচে মিশর একসময় ২-০ গোলে এগিয়ে থাকলেও শেষ ১৫ মিনিটে সেই লিড হারিয়ে শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে পরাজিত হয়। ম্যাচটি পরিচালনা করেন ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে। মিশর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারিং সিদ্ধান্ত। এর মধ্যে ভিডিও সহকারী রেফারির (ভিএআর) পর্যালোচনার পর মিশরের একটি গোল বাতিল করা এবং ম্যাচের শেষ দিকে মোহাম্মদ সালাহকে ঘিরে পেনাল্টির আবেদন যথাযথভাবে পর্যালোচনা না করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ম্যাচে শৃঙ্খলাজনিত সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। তাদের দাবি, মিশরের খেলোয়াড়দের পাঁচটি হলুদ কার্ড দেখানো হয় এবং কোচিং স্টাফের একজন সদস্যকে মাঠ ছাড়তে বলা হয়। অন্যদিকে পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনার কোনো খেলোয়াড়ই হলুদ কার্ড দেখেননি। মিশর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্য, ম্যাচের আগেই তারা ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েকে রেফারি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিল। এদিকে মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসানও ম্যাচ চলাকালে হলুদ কার্ড দেখেন। সংস্থাটির দাবি, রেফারির উদ্দেশে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতীকী একটি ইঙ্গিত দেওয়ার পরই তাকে সতর্ক করা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত মিশরের এই অভিযোগের বিষয়ে ফিফা কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন