প্রতি বর্ষায় বাংলাদেশে কমবেশি বন্যার প্রকোপ দেখা যায়। দেশের, বিশেষ করে নি¤œাঞ্চলের মানুষ বন্যার দুর্ভোগ সহ্য করেন, স্বজন হারান। কিন্তু প্রতিবছরই একটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসেÑ আমরা কি সত্যিই আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছি? এবারের অতি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে সাত জেলায় ৪৪ জনের প্রাণহানি, ১০ লাখের বেশি মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এবং কয়েক লাখ মানুষের পানিবন্দি জীবন সেই প্রশ্নকেই আরও তীব্র করেছে।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি মৌসুমি দুর্যোগের চিত্র নয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পাহাড় ও নদী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বয়হীনতার সম্মিলিত প্রতিফলন। একদিকে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত, অন্যদিকে পাহাড়ি ঢল ও নদীর পানি বৃদ্ধিÑ সব মিলিয়ে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মৎস্যসম্পদ, যোগাযোগব্যবস্থা ও শিক্ষা কার্যক্রমÑ সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সরকার উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে অর্থ ও খাদ্য সহায়তা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থাকে মাঠে নামানো হয়েছে। এসব উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সাফল্য বরাদ্দের পরিমাণে নয়, বরং সহায়তা কত দ্রুত এবং কতটা সুষ্ঠুভাবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে। দুর্গত এলাকার বহু মানুষের অভিযোগ, তারা এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি কিংবা চিকিৎসাসেবা পাননি। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয়, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় পুরো দায়িত্ব এখন প্রশাসনের ওপর এসে পড়েছে। উপজেলা প্রশাসন সীমিত জনবল ও সক্ষমতা নিয়ে এত বড় দুর্যোগ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। দুর্যোগ কখনো একক কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, রেড ক্রিসেন্ট, স্কাউট, যুব সংগঠন এবং কমিউনিটিভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই হবে। একই সঙ্গে নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, আগামী কয়েকদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান সংকট আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখনই নদীর পানি পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়া, আশ্রয় কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বন্যা-পরবর্তী সময়ে কৃষক, মৎস্যচাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের জন্য কার্যকর কর্মসূচি নিতে হবে, যাতে তারা দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
বন্যার তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে ওঠে জনস্বাস্থ্য। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, চর্মরোগ, সাপের কামড় এবং মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা শিশু, গর্ভবতী নারী, প্রবীণ ও রোগাক্রান্তরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই এখন থেকেই প্রতিটি দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন নিশ্চিত করা, ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ওআরএস মজুত রাখা এবং টিকাদান ও স্বাস্থ্য-সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি ও মৎস্য খাত পুনর্বাসনের জন্য দ্রুত ও স্বচ্ছ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠনকে কেবল অবকাঠামো মেরামতে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের জীবন-জীবিকা ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের এই নতুন বাস্তবতায় পুরোনো প্রস্তুতি আর যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আগাম সতর্কবার্তা আরও কার্যকর করা, পাহাড় ও নদী ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা গ্রহণ, জলাবদ্ধতা সৃষ্টিকারী অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করা। প্রতি বছর বন্যার পর একই ধরনের প্রতিশ্রুতি নয়, এবার প্রয়োজন বাস্তবায়নযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ। কারণ একটি দুর্যোগ শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি দুর্যোগের আশঙ্কা যখন সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন