১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের পর যেন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ থেকে হারিয়েই গিয়েছিল নরওয়ে। একের পর এক বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ব্যর্থতা, প্রজন্ম বদল এবং প্রত্যাশা-হতাশার দোলাচলে কেটে গেছে ২৮ বছর। অবশেষে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে। নতুন প্রজন্মের তারকা ফুটবলারদের নিয়ে গড়া নরওয়ে শুধু বিশ্বকাপে ফিরেই ক্ষান্ত থাকেনি, নিজেদের অন্যতম প্রতিযোগী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই প্রত্যাবর্তন নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা। কারণ এটি কেবল একটি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ নয়, বরং একটি ফুটবল সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের প্রতীক। বিশ্ব ফুটবলে গোল করার যন্ত্র হিসেবে পরিচিত আরলিং হালান্ড ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজের সামর্থ্যরে আরেকটি অসাধারণ উদাহরণ তুলে ধরেছেন। বাছাইপর্ব থেকেই তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও তার গতি, শক্তি, নিখুঁত ফিনিশিং এবং অসাধারণ পজিশনিং নরওয়েকে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ জয় এনে দেয়।
মূল পর্বেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন হালান্ড। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ভেঙে দেওয়া, কঠিন মুহূর্তে গোল করে দলকে এগিয়ে নেওয়া এবং সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অসাধারণ। প্রতিটি ম্যাচেই তিনি ছিলেন প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম।
অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ পরিচালনা করেছেন দুর্দান্ত দক্ষতায়। তার নিখুঁত পাস, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ এবং সৃজনশীলতা নরওয়ের আক্রমণকে করেছে আরও প্রাণবন্ত। রক্ষণভাগও ছিল যথেষ্ট দৃঢ়।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নরওয়ের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত আসে ব্রাজিলের বিপক্ষে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে অনেকেই নরওয়েকে আন্ডারডগ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু মাঠের খেলায় সেই ধারণা বদলে যায়।
হালান্ডের নেতৃত্বে নরওয়ে সাহসী ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়। ব্রাজিলকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার মাধ্যমে দলটি নতুন ইতিহাস রচনা করে।
কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লড়াই ছিল সমানে সমান। দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয়। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় নরওয়ে। যদিও স্বপ্নের যাত্রা সেমিফাইনালে পৌঁছায়নি, তবুও এই হার নরওয়ের অর্জনকে ম্লান করতে পারেনি। বিশ্ব ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই দল ভবিষ্যতের বড় টুর্নামেন্টগুলোতে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরবে।
২০২৬ বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে, নরওয়ে আর শুধু সম্ভাবনাময় একটি দল নয়; তারা এখন বড় দলগুলোর জন্যও ভয়ের কারণ। ২৮ বছরের অপেক্ষার পর বিশ্বকাপে ফিরে নরওয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং প্রতিভার সঠিক সমন্বয় থাকলে যেকোনো স্বপ্নই বাস্তবে রূপ নিতে পারে। আর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ নিঃসন্দেহে আরলিং হালান্ডÑ যার অতিমানবীয় পারফরম্যান্স পুরো বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, কেন তিনি বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন