সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এতে ঘটনার মূল হোতা ও প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে (২৮) মৃত্যুদ-াদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে এ ঘটনায় সমানভাবে জড়িত থাকার অপরাধে আরও তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদ- ও অর্থদ- দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ায় চার আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার জনাকীর্ণ আদালতে আসামিদের উপস্থিতিতে বহুল আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়কে কেন্দ্র করে আদালত পাড়াসহ সিলেটজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যাবজ্জীবন কারাদ-ে দ-িত তিন আসামি হলেনÑ শাহ মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮) ও অর্জুন কর (২৬)। যাবজ্জীবন সাজার পাশাপাশি এই তিন আসামির প্রত্যেককে অতিরিক্ত এক লাখ টাকা করে অর্থদ- দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মামলার অপর একটি ধারায় এই তিনজনকে আরও ১৪ বছরের সশ্রম কারাদ-, ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- এবং অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদ- দেওয়া হয়। দ-প্রাপ্ত তিন আসামির জরিমানার মোট সাড়ে চার লাখ টাকা ভিকটিমের পরিবারকে হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
অন্যদিকে, অপরাধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় রবিউল ইসলাম (২৫), মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫), আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল (২৬) ও মিজবাউল ইসলাম রাজনকে (২৭) মামলা থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। অন্য কোনো মামলায় যদি তারা গ্রেপ্তার না থাকেন, তবে তাদের দ্রুত মুক্তি দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় আদালতে অভিযুক্ত আটজন আসামি কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
রায়ের পাশাপাশি মামলার জব্দকৃত আলামত নিয়েও বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন বিচারক। ঘটনার সময় জব্দ করা ঢাকা মেট্রো ভ-০২-১৩৬২ নম্বরের প্রাইভেট কারটি মামলার মূল এজাহারকারীকে ফেরত দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে। তবে জব্দ হওয়া লাল রঙের পুরাতন পালসার মোটরসাইকেলটির কোনো বৈধ দাবিদার না থাকায় তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া প্রধান আসামি সাইফুর রহমানের কক্ষ থেকে জব্দ হওয়া নকিয়া ব্র্যান্ডের দুটি মোবাইল ফোন তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে স্বামীর সঙ্গে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে বেড়াতে গিয়েছিলেন এক গৃহবধূ। সেখান থেকে তৎকালীন কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী ওই দম্পতিকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে ছাত্রাবাসে আটকে রাখে। সেখানে স্বামীকে মারধর করে জিম্মি করে তরুণীকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। বর্বরোচিত এই ঘটনার পরদিন ২৬ সেপ্টেম্বর সকালে ভুক্তভোগীর স্বামী বাদী হয়ে শাহপরাণ থানায় ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমানকে প্রধান আসামি করে ছয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও দুজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
লোমহর্ষক এই ঘটনাটি সে সময় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, গণঅসন্তোষ ও প্রতিবাদের ঝড় তোলে। ঘটনার পরপরই আসামিরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশ ও র্যাবের যৌথ তৎপরতায় তিন দিনের মধ্যে এজাহারে থাকা ছয়জন এবং সন্দেহভাজন আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পর আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়, যেখানে প্রধান চার আসামি সরাসরি ধর্ষণের কথা এবং বাকি দুজন সহায়তার কথা স্বীকার করে। পরে ডিএনএ পরীক্ষায় আটজনের মধ্যে ছয়জন আসামির নমুনার শতভাগ মিল পাওয়া যায়।
ঘটনার দুই মাস আট দিন পর ২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরাণ থানার পরিদর্শক ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য আট আসামির বিরুদ্ধে আদালতে ১৭ পৃষ্ঠার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ অভিযোগপত্র দাখিল করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে মামলাটি পরে দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী দম্পতি, ম্যাজিস্ট্রেট, তদন্ত কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদেরসহ মোট ২৪ জন সাক্ষী আদালতে তাদের সাক্ষ্য প্রদান করেন। ধর্ষণের এই মূল মামলার পাশাপাশি ঘটনার রাতে সাইফুর রহমানের কক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় একটি অস্ত্র মামলা এবং ভুক্তভোগীদের গাড়ি ছিনতাই ও চাঁদা দাবির অভিযোগে পুলিশ বাদী হয়ে আরও একটি পৃথক মামলা দায়ের করেছিল।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন