মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, অন্যদিকে আলোচনার পথ এখনো খোলা রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। একই সময়ে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় টানা তৃতীয় দিনের মতো হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের কড়া বার্তা : এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা মানেনি। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের কারণেই ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারেনি এবং তা না হলে ইসরায়েলের অস্তিত্ব বড় হুমকির মুখে পড়ত। তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে খুব কঠোর হামলা চালানো হবে এবং পরবর্তী দিনগুলোতেও সেই অভিযান অব্যাহত থাকবে। তার ভাষায়, ইরানের পক্ষে এর কার্যকর জবাব দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই।
ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু : ট্রাম্প ইরানের নাতাঞ্জ এলাকার কাছে অবস্থিত একটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ওই স্থাপনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে সেখানেও হামলা চালানো হবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ওই স্থাপনা অত্যন্ত গভীরে নির্মিত হওয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাঙ্কার ভেদকারী অস্ত্র দিয়েও সম্পূর্ণ ধ্বংস করা কঠিন হতে পারে। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, প্রয়োজন হলে সেটিও ধ্বংস করা হবে।
টানা তৃতীয় দিনের মার্কিন হামলা : ট্রাম্পের ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড জানায়, প্রেসিডেন্টের নির্দেশে টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানে নতুন করে হামলা চালানো হয়েছে। পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী অভিযানে বুশেহর, চাহ বাহার, জাস্ক, কোনারক, আবু মুসা, বন্দর আব্বাসসহ একাধিক সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানে। উপকূলীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ড্রোন ঘাঁটি এবং নৌবাহিনীর সক্ষমতা দুর্বল করাই ছিল এই অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য। মার্কিন বাহিনীর দাবি, অত্যন্ত নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করে এসব হামলা চালানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল মার্কিন সেনা মোতায়েন : যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ৫০ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। পরিস্থিতির যেকোনো পরিবর্তনের জন্য তারা সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। এই বিপুল সেনা উপস্থিতি সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাকে বাড়িয়ে তুলেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
জর্ডানে হামলার দাবি ইরানের : মার্কিন হামলার জবাবে জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। তাদের বক্তব্য, জর্ডানের জনগণের সঙ্গে ইরানের কোনো শত্রুতা নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য জর্ডানের শাসকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া চারটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন বিরোধ : বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরেও নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দেবে এবং এই পথে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজ থেকে ২০ শতাংশ অর্থ আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। তার দাবি, এই সমুদ্রপথ খোলা থাকবে এবং ইরান থাকুক বা না থাকুক, যুক্তরাষ্ট্র সেটি নিশ্চিত করবে। তবে ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক নেতৃত্ব এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের বক্তব্য, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র ইরানের এবং কোনো বিদেশি শক্তির সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই।
নৌ অবরোধ নিয়ে বিতর্ক : যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যৌথ সামুদ্রিক তথ্যকেন্দ্র জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নৌ অবরোধ কার্যকর করা হবে। এই ব্যবস্থার আওতায় ইরানের উপকূল, বন্দর ও তেল টার্মিনালকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে জানানো হয়েছে, অন্য দেশের গন্তব্যে নিরপেক্ষভাবে চলাচলকারী জাহাজের স্বাভাবিক যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হবে না। মানবিক সহায়তাবাহী জাহাজও নির্দিষ্ট শর্তে চলাচল করতে পারবে।
জাতিসংঘের নৌ চলাচল সংস্থা অবশ্য আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাধ্যতামূলক অর্থ আদায়ের বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, এমন পদক্ষেপের আন্তর্জাতিক আইনে সুস্পষ্ট ভিত্তি নেই।
তেলবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ অংশে দুটি তেলবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, ওমান উপকূলের কাছে চলাচলের সময় দুটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, তারা দুটি আক্রমণাত্মক সুপার ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তাদের অভিযোগ, জাহাজগুলো সতর্কবার্তা অমান্য করেছিল এবং অবৈধভাবে চলাচল করছিল। এই হামলায় এক ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
মার্কিন হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে : যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন বাহিনীর হতাহতের সংখ্যাও ক্রমে বাড়ছে। সর্বশেষ সরকারি হিসাবে নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন চার শতাধিক সেনাসদস্য। সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আহতদের বড় একটি অংশ বিস্ফোরণের অভিঘাতে মস্তিষ্কজনিত সমস্যায় ভুগছেন। দীর্ঘমেয়াদে এসব আঘাত সেনাদের স্বাভাবিক জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইয়েমেনেও বাড়ছে যুদ্ধের আশঙ্কা : এদিকে ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপেও সমর্থন দিয়েছেন ট্রাম্প। সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ করে সৌদি হামলার পর হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক বছর ধরে কার্যকর অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে ইয়েমেনেও আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হতে পারে। এর প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন