বাঙালি দর্শকের হৃদয়ে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন এক সৌম্য, মার্জিত আর অভিজাত রুপালি পর্দার রাজপুত্র হয়ে। ঢাকাই চলচ্চিত্রের প্রথম ‘মহানায়ক’ এবং রুপালি পর্দার প্রথম ‘দেবদাস’খ্যাত কালজয়ী অভিনেতা বুলবুল আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১০ সালের এই দিনে সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন এই গুণী শিল্পী। তার প্রস্থানে বাংলা চলচ্চিত্র ও নাট্যাঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা আজও অপূরণীয়।
১৯৪১ সালের পুরান ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই ক্ষণজন্মা মানুষের আসল নাম ছিল তাবারক আহমেদ। নটরডেম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মেধাবী ছাত্র অভিনয়ে আসার আগে পেশায় ছিলেন একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি ব্যাংকিং সেক্টরে কর্মরত ছিলেন। তবে ভেতরের শিল্পীসত্তা তাকে বেশিদিন চার দেয়ালের ফাইলে আটকে রাখতে পারেনি। মঞ্চ ও টিভির গ-ি পেরিয়ে ১৯৭৩ সালে ‘ইয়ে করে বিয়ে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তার অভিষেক ঘটে।
বুলবুল আহমেদ মানেই ছিল পর্দায় আভিজাত্য আর নিখুঁত অভিনয়ের মেলবন্ধন। পরিচালক চাষী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত ‘দেবদাস’ চলচ্চিত্রে তার অভিনয় বাঙালি দর্শকদের মনে চিরস্থায়ী আসন করে দেয়। শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ কিংবা ‘শ্রীকান্ত’ চরিত্রের সেই বিষাদগ্রস্ত ও গভীর প্রেমিকের রূপ তার চেয়ে নিখুঁতভাবে আর কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারেননি।
সত্তর ও আশির দশকে প্রখ্যাত পরিচালক আলমগীর কবিরের ‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘রূপালী সৈকতে’ এবং ‘মোহনা’ চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে তিনি চলচ্চিত্রে ভিন্ন ধারা তৈরি করেন। এ ছাড়া টিভি নাটকেও তার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের ‘এই সব দিনরাত্রি’ নাটকের ‘শফিক’ চরিত্রটি আজও দর্শকদের চোখে জল এনে দেয়।
অভিনয় জীবনে অনন্য অবদানের জন্য তিনি চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। শুধু অভিনয়েই নয়, চলচ্চিত্র পরিচালনায়ও তিনি মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। ১৯৮৭ সালে তার পরিচালিত ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ সিনেমাটি অভাবনীয় সাফল্য পায় এবং পরিচালক হিসেবেও তিনি জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন।
বুলবুল আহমেদের চলে যাওয়ার দিনটি তার পরিবারের কাছে এক ভীষণ বেদনার। তার সুযোগ্য কন্যা অভিনেত্রী তাজিন আহমেদ ঐন্দ্রিলা এক স্মৃতিকথায় রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘জুলাই মাস আসলেই মন খারাপ থাকে। কয়েক দিন ধরে আব্বুর পরিচালিত ও আমার অভিনীত নাটকগুলো দেখছি। দেখতে দেখতে ১৬ বছর হয়ে গেছে আব্বু নেই। দীর্ঘ সময় ধরে তাকে ধরতে পারি না। এই দিনটায় বাবাকে ভীষণ মিস করি। বিশেষ করে তার ছায়াটা খুব মিস করি। তিনি না থেকেও সবসময় আমাদের অনুভূতিতে জড়িয়ে আছেন।’
এই অভিনেত্রী জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও তার স্মরণে পরিবারের পক্ষ থেকে মগবাজারের সরপটিমিসট ইন্টারন্যাশনাল সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুলে খাবার বিতরণ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
চলচ্চিত্রের সাদাকালো যুগের এই মহাতারকা কালের সীমানা পেরিয়ে আজও প্রতিটি প্রজন্মের মনে রঙিন আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। ঢাকাই সিনেমার এই মহানায়কের প্রয়াণ দিবসে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন