× UCB Sticker Card
শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

প্রফেসর ড. মো. আবু তালেব

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৬:৪১ এএম

কর্মহীন তরুণ নয়, চাই স্বপ্নবান উদ্যোক্তা

প্রফেসর ড. মো. আবু তালেব

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৬:৪১ এএম

কর্মহীন তরুণ নয়, চাই স্বপ্নবান উদ্যোক্তা

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু আজ এই শক্তির একটি বড় অংশ কর্মহীনতা, হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদ নিয়ে বের হলেও তাদের অনেকেই চাকরির বাজারে প্রবেশ করে দীর্ঘ অপেক্ষা, হতাশা ও ব্যর্থতার মুখোমুখি হচ্ছে। একসময় যে তরুণরা দেশের উন্নয়নের স্বপ্ন দেখত, তাদের অনেকেই আজ শুধু একটি চাকরির আশায় জীবন থামিয়ে রেখেছে। অথচ বাস্তবতা হলোÑ চাকরির সীমিত বাজার দিয়ে এ বিশাল যুব জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হলো, কর্মহীন তরুণ তৈরি নয়; বরং স্বপ্নবান উদ্যোক্তা তৈরি করা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (ইইঝ) ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। সরকারি চাকরির সীমিত সুযোগের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যায়। একটি পদের জন্য হাজার হাজার আবেদন এখন স্বাভাবিক ঘটনা। ফলে তরুণদের বড় একটি অংশ বছরের পর বছর শুধু চাকরির প্রস্তুতিতে সময় পার করছে। এই দীর্ঘ প্রতিযোগিতা অনেকের আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলোÑ তরুণদের কি শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবেই গড়ে তোলা হবে, নাকি তাদেরকে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উদ্যোক্তায় রূপান্তর করা হবে? বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, উদ্যোক্তারাই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা চীনের উন্নয়নের পেছনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিরাট অবদান রয়েছে। নতুন নতুন উদ্যোগ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা ও উদ্ভাবন লাখো মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলোÑ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার চেয়ে চাকরির পেছনে দৌড়াতে বেশি উৎসাহিত করে।

শৈশব থেকেই আমাদের সমাজে একটি ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়Ñ ‘ভালোভাবে পড়াশোনা করো, তাহলে ভালো চাকরি পাবে।’ কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই শেখানো হয় কীভাবে একজন উদ্যোক্তা হতে হয়, কীভাবে নতুন ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়, কিংবা কীভাবে ঝুঁকি নিয়ে সফল হতে হয়। ফলে অধিকাংশ তরুণ চাকরিকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে ধরে নেয়। অথচ বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন কর্মসংস্থানের নতুন পথ তৈরি হচ্ছে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তাবৃত্তিকে ঘিরে।

বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনাময় অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স, কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, অনলাইন সেবা, ফ্রিল্যান্সিং, পর্যটন, হস্তশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে তরুণরা নতুন উদ্যোগ নিতে পারে। ইতোমধ্যে অনেক তরুণ ছোট পরিসরে শুরু করে সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কেউ অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন, কেউ আধুনিক কৃষির মাধ্যমে লাভবান হচ্ছেন, আবার কেউ প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ গড়ে বৈদেশিক বাজারেও প্রবেশ করছেন।

বিশেষভাবে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে হাজার হাজার তরুণ ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইনভিত্তিক কাজের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কনটেন্ট ক্রিয়েশনÑ এসব খাত নতুন প্রজন্মের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করতে হলে প্রয়োজন দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা।

এখানে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, স্টার্টআপ তহবিল, প্রশিক্ষণ ও বাজার-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে জামানত, জটিলতা ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে অনেক তরুণ পিছিয়ে যায়। অথচ নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা নীতিমালা ও সহায়তা ব্যবস্থা থাকলে তারা আরও সাহস নিয়ে এগিয়ে আসতে পারবে। শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।

একইসঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায়ও বড় পরিবর্তন জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে উদ্যোক্তা শিক্ষা, ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, আর্থিক পরিকল্পনা ও উদ্ভাবনভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। গবেষণা ও উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার গুরুত্বও এখানে অপরিসীম। উন্নত দেশগুলোতে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে তরুণরা দ্রুত কর্মজীবনে প্রবেশ করে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অনেক পরিবার কারিগরি শিক্ষাকে অবমূল্যায়ন করে। এই মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি। একজন দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, কৃষি উদ্যোক্তা কিংবা ডিজিটাল সেবা প্রদানকারী আজ আন্তর্জাতিক বাজারেও সফল হতে পারেন।

তবে উদ্যোক্তা তৈরির পথে শুধু অর্থনৈতিক বাধাই নয়, সামাজিক বাধাও রয়েছে। আমাদের সমাজে এখনো ব্যবসায় ব্যর্থ হওয়াকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। ফলে অনেক তরুণ ঝুঁকি নিতে ভয় পায়। অথচ বিশ্বজুড়ে সফল উদ্যোক্তাদের জীবনে ব্যর্থতা একটি সাধারণ অধ্যায়। তাই তরুণদের এমন মানসিকতা শেখাতে হবে, যেখানে ব্যর্থতা হবে নতুন শেখার সুযোগ, হতাশার কারণ নয়।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলোÑ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্য। অনেক তরুণ মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সুযোগ পায় না। এতে তাদের মধ্যে হতাশা জন্মায়। রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে চায়, তবে প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে, ব্যবসাবান্ধব নীতি নিশ্চিত করতে হবে এবং মেধাবী তরুণদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে তরুণরাই সবসময় পরিবর্তনের অগ্রদূত। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধÑ সবক্ষেত্রেই যুব সমাজের নেতৃত্ব ছিল অনন্য। আজ সেই তরুণদের নতুন যুদ্ধ বেকারত্বের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধে জয়ী হতে হলে শুধু চাকরির আশায় বসে থাকলে চলবে না; বরং নতুন চিন্তা, নতুন উদ্যোগ ও নতুন সম্ভাবনার পথে হাঁটতে হবে।

কর্মহীন তরুণ কোনো জাতির জন্য আশীর্বাদ নয়; কিন্তু স্বপ্নবান উদ্যোক্তা একটি জাতির অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে। একজন উদ্যোক্তা শুধু নিজের আয় নিশ্চিত করেন না, বরং আরও বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেন। তাই এখন সময় এসেছে তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে গড়ে তোলার।

অতএব, বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিনিয়োগ হতে হবে যুব সমাজে। তাদের দক্ষতা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা মানসিকতাকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ শুধু বেকারত্ব সংকট কাটিয়েই উঠবে না; বরং একটি আত্মনির্ভর, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। তাই আজকের শপথ হোক কর্মহীন তরুণ নয়, চাই স্বপ্নবান উদ্যোক্তা।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট এবং অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!