× UCB Sticker Card
শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ইসলামের আলো ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৬:৪৬ এএম

খোদাভীতি ও পরম আশাবাদের মেলবন্ধন

ইসলামের আলো ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৬:৪৬ এএম

খোদাভীতি ও পরম আশাবাদের মেলবন্ধন

মানবজীবনের গতিপথ সরলরেখায় চলে না। আলো আর অন্ধকারের অবিরাম আবর্তনে সুখের পাশাপাশি দুঃখ, জরা ও সংকটের মেঘ এসে গ্রাস করে আমাদের চেনা পরিধিকে। কখনো আর্থিক অনটন, কখনো পারিবারিক মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব, আবার কখনো বা প্রিয়জনের বিয়োগব্যথা মানুষকে এক গভীর শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। এমন প্রতিকূল মুহূর্তে মানবমন স্বভাবতই ভেঙে পড়ে, কেউ কেউ নিয়তিকে দোষারোপ করে বসেন। কিন্তু ইসলামের আধ্যাত্মিক দর্শনে এই কঠিন সময়গুলোই হলো অন্তরের পরমতম ইবাদতের কষ্টিপাথর। আর সেই অনন্য ইবাদতের নাম ‘হুসনে জান্ন’ বা মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি উত্তম ধারণা পোষণ করা। এটি এমন এক মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক সাধনা, যাতে কোনো শারীরিক পরিশ্রমের ক্লান্তি নেই, অথচ এর অবস্থান মানুষের চিন্তার গভীরতম প্রকোষ্ঠে হওয়ায় এটি অর্জন করা মানব ইতিহাসের অন্যতম কঠিন কাজ। ড. ইয়াসির ক্বাদির এক তাত্ত্বিক আলোচনা অনুসরণে এই অন্তরের ইবাদতের গভীরতা ও তাৎপর্য এখানে উন্মোচন করা হলো।

ইসলামের পরিভাষায় ‘হুসনে জান্ন’ কেবল একটি ইতিবাচক চিন্তার নাম নয়, বরং এটি হলো ইমানের সুদৃঢ় স্তম্ভ। বাস্তব পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, নিজের ভেতরের প্রবল মানসিক সংগ্রাম ও কষ্টকে আল্লাহর প্রতি পরম আস্থা ও ইতিবাচকতার সুতোয় বেঁধে রাখাই হলো ইবাদতের সর্বোচ্চ স্তর। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা পোষণ করা ইমানেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। অপরদিকে, পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সুরায় নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে, আল্লাহর প্রতি মন্দ বা নেতিবাচক ধারণা রাখা মুনাফিক ও কাফেরদের মজ্জাগত স্বভাব। তারা নিজেদের জীবনের যেকোনো ব্যর্থতা বা বিপর্যয়কে ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস বলে চালিয়ে দিতে চায় এবং দায় এড়ানোর মানসিকতা থেকে বলে, ‘আমাদের তো কিছু করার নেই, আল্লাহ আমাদের জন্য এটাই লিখে রেখেছিলেন।’ এই ধরনের ভাগ্যবাদী ও হতাশাজনক কুধারণা এমন এক রুগ্ণ মন থেকে উৎসারিত হয়, যা ইসলামের সুমহান ও ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বাসের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।

আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা রাখার অর্থ এই নয় যে, মানুষের ওপর কোনো বিপদ বা ট্র্যাজেডি এলে তাকে জোর করে কৃত্রিম আনন্দের অভিনয় করতে হবে। জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় চাকরি হারালে, দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি হলে কিংবা সন্তান অবাধ্য হলে ব্যথিত হওয়াটাই মানুষের চিরন্তন স্বভাব। ইসলামের মহান নবীও তাঁর শিশুপুত্র ইব্রাহিমের ইন্তেকালে অশ্রু বিসর্জন করেছিলেন। তবে ‘হুসনে জান্ন’-এর মূল নির্যাস হলো, যাবতীয় জাগতিক বেদনা ও সংকটের পেছনে এক পরম ঐশী পরিকল্পনা বা ডিভাইন প্ল্যান কাজ করছে, এই ধ্রুব সত্যকে মনেপ্রাণে স্বীকার করে নেওয়া। ওহুদের যুদ্ধের কঠিন বিপর্যয়ের পর মুনাফিকরা আফসোস করে বলেছিল, ‘তোমরা যদি আমাদের কথা শুনতে, তবে তোমাদের আজ প্রাণ হারাতে হতো না।’ এই আফসোস আসলে আল্লাহর তাকদির ও ফয়সালার ওপর তাদের অবিশ্বাসেরই বহির্প্রকাশ ছিল। পক্ষান্তরে, একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো, আল্লাহ তায়ালাই আমাদের একমাত্র মাওলা বা অভিভাবক এবং তিনি আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তার বাইরে কোনো কল্যাণ বা অকল্যাণ আমাদের স্পর্শ করতে পারে না। এই মহাজাগতিক নাট্যশালায় যা কিছু মন্দ বা নেতিবাচক বলে প্রতিভাত হয়, তার অন্তরালে এক পরম হিকমত বা ঐশী প্রজ্ঞা লুকিয়ে থাকে। উত্তম ধারণার দাবি হলো, মানুষ যেন এই সংকটের শেষ পরিণতিতে মন্দের চেয়ে কল্যাণের পাল্লা ভারী দেখবার মতো দূরদৃষ্টি অর্জন করে। যখন কোনো বিপদ আসে, তখন মুনাফিকের মতো অনবরত এই অভিযোগ না করা যে, কেন কেবল আমার সঙ্গেই এমন হচ্ছে? এটি অবিচার!’ বরং তায়েফের রক্তাক্ত ও নির্মম ঘটনার পর নবীজি (সা.) যেভাবে বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি যদি আমার ওপর অসন্তুষ্ট না হও, তবে এতেই আমি সন্তুষ্ট।’ সেই পরম আত্মসমর্পণের চেতনা বুকে ধারণ করাই হলো আসল সার্থকতা। কষ্ট ও শোকের মাঝেও এই বিশ্বাস অটুট রাখা যে, আল্লাহ তায়ালা এই নশ্বর দুনিয়া কিংবা আখিরাতে যা দান করবেন, তা আমাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া জিনিসের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান ও স্থায়ী হবে, এটাই হলো অন্তরের প্রকৃত সুস্থতা। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত বিখ্যাত হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ তায়ালার মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক রহস্য উন্মোচন করে বলেছেন, ‘আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা পোষণ করে, আমি তার সঙ্গে ঠিক তেমন আচরণই করি।’ এই অমোঘ বাণীর গভীর অর্থ হলো, মানুষ যখন আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে তাওয়াক্কুল বা ভরসা করে, তখন তার চিন্তার জগত স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইতিবাচকতায় ভরে ওঠে। সে তখন অনুধাবন করতে পারে যে, চলমান পরীক্ষা তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং আধ্যাত্মিকভাবে সম্মানিত করার জন্য; তাকে অপমান করার জন্য নয়, বরং আড়ালে কোনো বড় বরকত দেওয়ার জন্য। আল্লাহ যখন কোনো দরজা বন্ধ করেন, তখন তিনি মূলত বান্দার জন্য আরও চমৎকার কোনো তোরণ উন্মোচন করেন। ফলে বান্দার ইতিবাচক আশাবাদের সমান্তরালে আল্লাহর রহমত ও কুদরতও তার জীবনে সেভাবেই ধরা দেয়। ইসলামের এই আধ্যাত্মিক দর্শনের সঙ্গে আধুনিক মনস্তত্ত্বের ‘ইতিবাচক চিন্তা’ বা আশাবাদের এক গভীর সাযুজ্য রয়েছে। সিরাতের পাতায় পাতায় আমরা দেখতে পাই, রাসুলুল্লাহ (সা.) যেকোনো ঘোর অন্ধকার ও সংকটের মাঝেও কল্যাণের একটি গোপন বা লুকানো বার্তা খুঁজে নিতেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন অবুঝ শিশু যখন কোনো মস্ত বড় ভুল করে তার পিতামাতার বুকে কেঁদে আছড়ে পড়ে, তখন পিতা-মাতার সমস্ত রাগ গলে গিয়ে ভালোবাসার ফল্গুধারা বয়ে যায়। অথচ সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার ভালোবাসা তো কোনো পার্থিব মায়ের ভালোবাসার চেয়েও কোটি গুণ বেশি গভীর। বান্দা যখন নিভৃতে, অশ্রুসিক্ত নয়নে আল্লাহর দিকে মুখ ফেরায় এবং বিশ্বাস করে যে ‘আমার আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই’, তখন আল্লাহ তাঁর পরম মহত্ব ও দাতার শাশ্বত বৈশিষ্ট্যের খাতিরে সেই বান্দাকে কখনো খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না।

যেকোনো সমাজ বা ব্যক্তির সামগ্রিক পরিবর্তনের সূচনা হয় মূলত তার চিন্তা ও মগজের গভীর থেকে। ইসলামের আধ্যাত্মিক সংস্কারের মূল ভিত্তিই হলো এই অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর। জীবনের কঠিনতম মুহূর্তগুলোতে আল্লাহর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাবের পরিবর্তন ঘটিয়ে পরম আশাবাদকে জাগ্রত করাই হলো ইমানের আসল আলামত। যে হৃদয় আল্লাহকে গভীরভাবে ভালোবাসে ও বিশ্বাস করে, সেই হৃদয়েই কেবল এই নিভৃত ইবাদতের চাষ সম্ভব। অতএব, পরম করুণাময়ের প্রতি আমাদের সুধারণা যেন কেবল মৌখিক বুলি না হয়ে জীবনের প্রতিটি ট্র্যাজেডি ও সংকটে আমাদের পথ চলার প্রধান পাথেয় হয়ে ওঠে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে এক সুদৃঢ় ইমান, অবিচল আশাবাদ এবং অন্তরের এই সুমহান ইবাদত তথা ‘হুসনে জান্ন’ ধারণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!