মহাবিশ্বের পরম অধিপতি মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানবজাতিকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে ঘোষণা করে তাদের আত্মিক ও জাগতিক উৎকর্ষের এক অসীম দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তবে এই আলোর পথের সমান্তরালে তিনি মানুষের জন্য এক চিরন্তন ও প্রকাশ্য শত্রুর অস্তিত্বকেও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যাতে মানুষ তার প্ররোচনা ও বিভ্রান্তির চোরাবালি সম্পর্কে সদা সতর্ক থাকতে পারে। সেই আদি ও অকৃত্রিম শত্রুর নাম ইবলিস বা শয়তান। সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে আজ অবধি মানবাত্মাকে কলুষিত করা এবং আল্লাহর আনুগত্যের সরল পথ থেকে বিচ্যুত করাই তার একমাত্র ব্রত। শয়তানের এই নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ কোনো প্রকাশ্য তরবারি বা অস্ত্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না; বরং এর অবস্থান মানুষের চিন্তার গহিন প্রকোষ্ঠে, যা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মারাত্মক। এই আত্মিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে শয়তানের চক্রান্তের স্বরূপ উন্মোচন এবং তা থেকে মুক্তির শাশ্বত উপায়সমূহ অনুসন্ধান করা প্রতিটি মুমিনের জন্য এক অপরিহার্য মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক জিহাদ। পবিত্র কোরআনের অমোঘ ঘোষণায় শয়তানকে মানুষের ‘স্পষ্ট শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে মানবজাতিকে সাবধান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু, অতএব তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো।’ শয়তানের প্রধান রণকৌশল হলো মানুষের অন্তরে কুপ্ররোচনা বা ‘ওয়াসওয়াসা’ তৈরি করা।
সে কখনো মানুষকে সরাসরি পাপের আদেশ দেয় না, বরং অত্যন্ত সুনিপুণভাবে মানুষের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করে। মানুষকে আল্লাহর জিকির, জ্ঞান অর্জন এবং নেক আমল থেকে দূরে সরিয়ে রাখাই তার প্রাথমিক লক্ষ্য। একজন সাধক যখন ইখলাস বা খাঁটি নিয়তে আল্লাহর ইবাদত করতে চান, শয়তান তখন তার মনে রিয়া বা লোক দেখানোর ভাব জাগিয়ে তোলে। এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ থেকে বাঁচার একমাত্র প্রধান উপায় হলো মহান আল্লাহর দরবারে নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করা এবং তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা।
পবিত্র কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, যখনই অন্তরে কোনো নেতিবাচক বা পাপের চিন্তা উদয় হবে, তখনই ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পাঠ করে আল্লাহর সুরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করতে হবে। শয়তানের চক্রান্তের আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো, সে মানুষের সামনে মিথ্যা, বাতিল এবং অন্যায় কাজকে অত্যন্ত চমৎকার ও লোভনীয় করে ফুটিয়ে তোলে। পবিত্র কোরআনের বর্ণনায় শয়তানের সেই আদি দম্ভোক্তি ফুটে উঠেছে, যেখানে সে স্রষ্টার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘আমি অবশ্যই তাদের সামনে জমিনের বুকে পাপ কাজকে সুশোভিত করব এবং তাদের সকলকেই পথভ্রষ্ট করব।’ মানুষের অবচেতন মনকে প্রভাবিত করার এই খেলায় শয়তান অত্যন্ত পারদর্শী।
সে কুৎসিতকে সুন্দর, হারামকে আকর্ষণীয় এবং ক্ষণস্থায়ী জাগতিক মোহকে চিরন্তন সুখ হিসেবে মানবমস্তিস্কে গেঁথে দেয়। দীর্ঘমেয়াদি মিথ্যা আশা ও অলীক আকাক্সক্ষার মায়াজাল বুনে সে মানুষের বর্তমানকে ধ্বংস করে। আল্লাহ তায়ালা সতর্ক করে বলেছেন, শয়তান মানুষের আকাক্সক্ষাকে দীর্ঘায়িত করে এবং তাদের মিথ্যা সান্ত¡না দেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি কেবলই অনুশোচনা আর চিরস্থায়ী দেউলিয়াত্ব। মানুষের মনকে দুর্বল করার জন্য শয়তান প্রতিনিয়ত অভাব-অনটন ও দারিদ্র্যের ভয় দেখায়। মানুষের স্বভাবজাত লোভ ও ভীতিকে পুঁজি করে সে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘দান করলে তুমি নিঃস্ব হয়ে যাবে, সৎ পথে চললে তুমি পিছিয়ে পড়বে।’ এই মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের সুযোগ নিয়ে সে মানুষকে অবৈধ উপার্জন এবং অশ্লীলতার অন্ধকার গলিতে ঠেলে দেয়।
অথচ এর বিপরীতে পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা, অসীম প্রাচুর্য ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। শয়তানের আরেকটি সূক্ষ্ম চাল হলো আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করার প্ররোচনা দেওয়া, যা মানুষের প্রাকৃতিক ও আত্মিক ভারসাম্যকে নষ্ট করে দেয়। মানুষের চারপাশ থেকে, সামনে, পেছনে, ডান ও বাম দিক থেকে আক্রমণ করার যে চ্যালেঞ্জ শয়তান ছুড়ে দিয়েছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে অকৃতজ্ঞ বানানো। কারণ, একজন অকৃতজ্ঞ মানুষ সহজেই আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যায় এবং শয়তানের সহজ শিকারে পরিণত হয়।
এই সর্বব্যাপী মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক আক্রমণের বিরুদ্ধে মুমিনের সবচেয়ে বড় ঢাল হলো ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি এবং সার্বক্ষণিক আত্মসচেতনতা। পবিত্র কোরআনের সুমহান ঘোষণা অনুযায়ী, শয়তান যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আল্লাহর একনিষ্ঠ ও মুখলিস বান্দাদের ওপর তার কোনো প্রকৃত আধিপত্য বা নিয়ন্ত্রণ নেই। যারা নিজেদের আত্মাকে আল্লাহর স্মরণে সঁপে দিয়েছেন, তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালাই কর্মবিধায়ক হিসেবে যথেষ্ট। যখনই তাকওয়াবান মানুষদের শয়তানের কোনো দল বা প্ররোচনা স্পর্শ করে, তখনই তাদের আধ্যাত্মিক চোখ খুলে যায়। তারা তৎক্ষণাৎ নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন এবং আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে শয়তানের সূক্ষ্ম জাল ছিন্নভিন্ন করে দেন। জিকির বা আল্লাহর স্মরণ হলো শয়তানের বিরুদ্ধে মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে সুরক্ষিত দুর্গ, যেখানে প্রবেশ করলে শয়তানের সমস্ত চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে যায়।
শয়তানের এই মনস্তাত্ত্বিক জাল থেকে মুক্ত হতে হলে মানুষের নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রতিদিনের জীবনে পবিত্র কোরআনের আয়াতসমূহ এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ জিকিরের নিয়মিত চর্চা মানুষের অন্তরে এক অভেদ্য আধ্যাত্মিক প্রাচীর গড়ে তোলে। মানুষের অহংকার, রাগ এবং অতিরিক্ত জাগতিক লোভ শয়তানের প্রবেশের প্রধান দরজা। তাই আত্মশুদ্ধি বা তাজকিয়াতুন নাফসের মাধ্যমে নিজের ভেতরের এই পশুবৃত্তিকে দমন করা অপরিহার্য। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া ও জিকিরগুলো শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে এক একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করে। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে তার জীবনের প্রতিটি সংকট ও দুঃখের পেছনে আল্লাহর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞা রয়েছে এবং সে যখন আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা বা ‘হুসনে জান্ন’ পোষণ করে, তখন শয়তানের হতাশা ছড়ানোর সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।
চূড়ান্ত বিশ্লেষণে, শয়তানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধটি আসলে মানুষের নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। পরিবর্তনটা শুরু করতে হবে মানুষের নিজের মনস্তত্ত্ব ও চিন্তার জগত থেকে। যতক্ষণ না মানুষ সচেতনভাবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও রহমতের ওপর পূর্ণ আস্থা স্থাপন করছে, ততক্ষণ সে শয়তানের এই অদৃশ্য ফাঁদ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারবে না। আমাদের চারপাশের প্রতিকূলতা ও শয়তানের প্ররোচনা যতই তীব্র হোক না কেন, আল্লাহর অসীম দয়া ও ভালোবাসার প্রতি গভীর বিশ্বাসই আমাদের আলোর পথ দেখাবে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে শয়তানের যাবতীয় চক্রান্ত, কুপ্ররোচনা ও উসকানি থেকে রক্ষা করুন। তিনি আমাদের আত্মাকে বিশুদ্ধ করার তৌফিক দিন, মন্দ আমলের পঙ্কিলতা থেকে বাঁচিয়ে রাখুন এবং তাঁর পরম আশাবাদ ও তাকওয়ার চাদরে আমাদের জীবনকে আবৃত করুন। আমিন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন