‘খেতখোলা এভাবে ভেঙে গেলে আমরা কীভাবে খাব? আমাগো তো আর কিছু নাই। আমরা কোনো সাহায্য চাই না, শুধু নদীটা যদি বাঁধাইয়া দিত, বাড়িঘরটুকু যদি টিকত, তাহলে কোনো রকমে বেঁচে থাকতে পারতাম। শেষ সম্বলটুকু ভেঙে গেলে যাওয়ার আর কোনো জায়গা নাই।’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার পিংনা ইউনিয়নের নলসন্ধা গ্রামের বাসিন্দা ছালেহা বেগম। চোখের সামনে নিজের শেষ সম্বল কৃষিজমি যমুনার উত্তাল স্রোতে বিলীন হতে দেখে তার চোখের পানি যেন মিশে যায় নদীর পানির সঙ্গে।
ছালেহা বেগমের এই আর্তনাদ শুধু একজন মানুষের নয়; এটি যমুনার ভাঙনে সর্বস্ব হারানো হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট আর অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি। নদীভাঙন এই অঞ্চলের মানুষের কাছে নতুন কোনো দুর্যোগ নয়। যুগের পর যুগ ধরে যমুনার ভাঙনে ঘরবাড়ি, জমিজমা ও জীবিকার উৎস হারিয়ে অনেক পরিবার বারবার নতুন করে জীবন শুরু করেছে। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও ভাঙনের ভয়াবহতা কেড়ে নিচ্ছে মানুষের শেষ আশাটুকুও।
ছালেহা বেগম বলেন, জীবনে একাধিকবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন তিনি। প্রতিবারই নতুন করে ঘর বেঁধে বাঁচার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এবারের ভাঙন তাকে নিয়ে এসেছে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। ছালেহার পাশেই নদীর দিকে তাকিয়ে নির্বাক বসে ছিলেন সত্তরোর্ধ্ব করিম মন্ডল। ফসলের শেষ জমিটুকুও হারানোর পর যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।
করিম মন্ডল বলেন, ‘বাপ-দাদার আমলের জমি তো অনেক আগেই নদী খাইয়া ফেলছে। নিজের কষ্টের টাকায় যে জমি করছিলাম, সেটাও এখন শেষ সীমানায়। এই বয়সে বউ-বাচ্চা নিয়ে কোথায় যামু? যদি নদীর ভাঙনটা বন্ধ হতো, তাহলে ভাঙা বাড়িতেই কোনোভাবে শেষ জীবনটা কাটাইতে পারতাম।’ একই গ্রামের বাসিন্দা শাহানাজ বেগম জানান, মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে তার দুই বিঘা জমির পাটসহ সব ফসল নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। অনেক কষ্ট করে জমিটুকু আবাদ করেছিলাম। সেটাও চলে গেল। এখন সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেব কীভাবে বুঝতে পারছি না।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই যমুনার তীব্র ভাঙনে সরিষাবাড়ী উপজেলার নলসন্ধা, ডাকাতিয়ামেন্দা, মিরকুটিয়াসহ কয়েকটি গ্রামের মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। গত ১৫ দিনের ভাঙনে এসব এলাকায় শত শত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভাঙন অব্যাহত থাকলে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর, মসজিদ, মাদ্রাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অনুপ সিংহ জানান, চরাঞ্চলে এখনো পাট, তিলসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হচ্ছে। তবে পিংনা ইউনিয়নের নলসন্ধা এলাকায় যমুনার তীব্র ভাঙনে প্রায় ৮ হেক্টর পাট, ১৪ হেক্টর তিল এবং বিভিন্ন সবজিখেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরিষাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজা আফসানা বলেন, ‘ভাঙনের খবর পাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নিরাপদ স্থানে থাকার জন্য বলা হয়েছে। ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা নকিবুজ্জামান খান বলেন, ‘পিংনা ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। বর্তমানে নদীতে পানির প্রবল স্রোত থাকায় তাৎক্ষণিক প্রতিরক্ষা কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে পুরো এলাকা সমীক্ষা করে স্থায়ী নদীশাসনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।’ যমুনার ভাঙনে প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে সরিষাবাড়ীর মানুষের জীবনচিত্র। কারো বসতভিটা, কারো ফসলি জমি, আবার কারো দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদীর স্রোতে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দাবিÑ অস্থায়ী আশ্বাস নয়, যমুনার ভাঙন ঠেকাতে প্রয়োজন দ্রুত ও স্থায়ী পদক্ষেপ, যাতে আর কোনো পরিবারকে সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসতে না হয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন