× UCB Sticker Card
শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মোহাম্মদ সানাউল হক, প্রবাসী সাংবাদিক

প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ০৬:৫৫ এএম

প্রবাসে বাংলাদেশিদের সম্মান ফেরাবে দক্ষতা

মোহাম্মদ সানাউল হক, প্রবাসী সাংবাদিক

প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ০৬:৫৫ এএম

প্রবাসে বাংলাদেশিদের সম্মান ফেরাবে দক্ষতা

বাংলাদেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরবে শ্রমিক পাঠানো শুরু হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। ওই বছরই বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি আরবের মধ্যে চুক্তির ভিত্তিতে জনশক্তি রপ্তানির প্রক্রিয়া চালু হয়। এরপর থেকে সৌদি আরব ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গত পাঁচ দশকে নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, শিল্প, পরিবহন, গৃহস্থালি সেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও বিভিন্ন বেসরকারি খাতে লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে।

প্রবীণ প্রবাসীদের ভাষ্যমতে, ১৯৮০-এর দশকের সৌদি আরবের কর্মপরিবেশ বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেকটাই সহজ ছিল। তখন বাংলাদেশিসহ বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম থাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিল বেশি এবং প্রতিযোগিতা ছিল সীমিত। অনেকের মতে, সে সময় নিয়োগকর্তাদের আচরণে মানবিকতা ও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশও তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। দক্ষ ও অদক্ষ কর্মীদের মধ্যে পার্থক্যও আজকের মতো ততটা প্রকট ছিল না।

এই ২৬ সালে এসে যদি সেই চিন্তা মাথায় নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান, তাহলে বিদেশে এসে এ ঘাট-ও ঘাট দৌড়াদৌড়ি করে ক্লান্ত হওয়া ছাড়া আর কোন সফলতা মিলবে না। কাজের দক্ষতা, ভাষাগত দক্ষতা এসব এখন শুধু ইউরোপীয় দেশগুলোর চাহিদা নয়, শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে আরব উপসাগরীয় দেশগুলোতে এমন দক্ষতা এখন অনেক ক্ষেত্রেই বাধ্যতামূলক।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক সংবাদমাধ্যম এবং সৌদি আরবের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা এবহবৎধষ অঁঃযড়ৎরঃু ভড়ৎ ঝঃধঃরংঃরপং-এর প্রকাশিত তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করলে দেশটির শ্রমবাজার ও জনসংখ্যার কাঠামো সম্পর্কে একটি স্পষ্ট চিত্র উঠে আসে। ২০২২ সালের আদমশুমারি এবং ২০২৫ সালের সর্বশেষ শ্রমবাজার তথ্য এই বাস্তবতাকে আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরে। যেখানে দেশটির শ্রমবাজারে শতাধিক দেশের শ্রমিক উপস্থিত থাকলেও সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশিদেরই সবার শীর্ষে দেখানো হয়েছে।

২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সৌদি আরবে বৈধ বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ ৮০ হাজার, যা মোট ৩ কোটি ২২ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৪১.৬ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বিদেশি, যা সৌদি আরবের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে প্রবাসীদের নির্ভরশীলতা স্পষ্ট করে। অন্যদিকে, এঅঝঞঅঞ-এর ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে মোট কর্মরত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ বেসরকারি খাতে নিয়োজিত, যার হার ৬৭.৪ শতাংশ।

বিদেশি নাগরিকদের জাতিগত গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশিরা। তাদের বৈধ সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ ২০ হাজার, যা মোট বিদেশি বাসিন্দাদের ১৫.৮ শতাংশ, তবে অবৈধ প্রবাসীদের সংখ্যা এরচেয়ে দ্বিগুণ হবে বলে মনে করেন সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা। এরপরই রয়েছেন ভারতীয়দের অবস্থান, যাদের সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার (১৪ শতাংশ)। শীর্ষ পাঁচে আরও রয়েছে পাকিস্তান, ইয়েমেন এবং মিশরের নাগরিকরা, যা সৌদি আরবের শ্রমবাজারে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর শক্ত অবস্থানকে নির্দেশ করে।

সৌদি আরবে বলদিয়া বা রাস্তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজকে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে নি¤œস্তরের শ্রমনির্ভর পেশাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। সৌদি আরবে বিশ্বের শতাধিক দেশের নাগরিক বিভিন্ন খাতেÑ নির্মাণ, শিল্প, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা, আতিথেয়তা, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসা ও সেবামূলক কাজে নিয়োজিত থাকলেও বলদিয়া খাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত বেশি। ফলে এই পেশাটির সঙ্গে বাংলাদেশিদের একটি স্থায়ী পরিচিতি তৈরি হয়েছে বলে অনেক প্রবাসী মনে করেন।

অনেক প্রবাসীর মতে, এই বাস্তবতা কখনো কখনো বাংলাদেশি কর্মীদের সামগ্রিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের দাবি, সৌদি আরবে বর্তমানে বহু বাংলাদেশি উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং আরবি ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী হওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় পূর্বধারণার কারণে তাদের যোগ্যতা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না।

প্রবাসী নাঈম খান জানান, অল্প আয়ের কারণে কিছু বলদিয়া কর্মী অতিরিক্ত অর্থের আশায় পথচারী বা গাড়িচালকদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। তাদের দাবি, কোনো সৌদি নাগরিক বা দামি গাড়ি দেখলে কিছু কর্মী প্রয়োজনের তুলনায় কাছাকাছি গিয়ে পরিচ্ছন্নতার কাজ করার মাধ্যমে অনুদান পাওয়ার প্রত্যাশা করেন।

সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট পৌর কর্তৃপক্ষ বলদিয়া কর্মীদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাস্তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজের সময় কোনো কর্মী অযথা নাগরিকদের বা চলন্ত গাড়ির খুব কাছাকাছি অবস্থান করতে পারবেন না। অভিযোগ রয়েছে, কিছু কর্মী নির্ধারিত স্থানে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে পথচারী বা দামি গাড়ির আশপাশে অবস্থান করে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতেন, যা অনেকের কাছে বিরক্তিকর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

এ ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের মতে, সৌদি আরবে বলদিয়া খাতে বাংলাদেশিদের দৃশ্যমান উপস্থিতির কারণে অনেক সময় দক্ষ, উচ্চশিক্ষিত ও ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন বাংলাদেশি কর্মীরাও নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়ন পান না।

একই সঙ্গে প্রবাসী সমাজের কিছু সদস্যের অভিযোগ, বলদিয়া পেশায় কর্মরত অল্পসংখ্যক ব্যক্তি সামান্য আর্থিক লাভের আশায় অনৈতিক বা আইনবিরোধী কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়েন। তবে এসব অভিযোগ কোনোভাবেই পুরো বলদিয়া কর্মীসমাজের বিরুদ্ধে সাধারণীকরণ করা যায় না; ব্যক্তির অপরাধের দায় ব্যক্তিকেই বহন করতে হয়। তবুও এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তা সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের সামগ্রিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দেশের সুনাম ক্ষুণœ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে।

সৌদি আরবের শ্রমবাজারে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভারত, ফিলিপাইন, মিশরসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা নিজেদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও ভাষাজ্ঞানের ভিত্তিতে নানা ধরনের পেশায় কাজ করছেন। নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা, খুচরা বিক্রয়, আতিথেয়তা, পরিবহন, কারিগরি ও প্রশাসনিক খাতে এসব দেশের কর্মীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।

শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন দেশের কর্মীরা সাধারণত নিজেদের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা বিবেচনা করে পেশা নির্বাচন করেন। তুলনামূলক দক্ষতাভিত্তিক বা কারিগরি পেশায় কাজ করলে আয় বৃদ্ধি, পদোন্নতির সুযোগ, পেশাগত মর্যাদা এবং এক চাকরি থেকে আরেক চাকরিতে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই অনেক বিদেশি কর্মী সৌদি আরবে পৌঁছানোর আগে নির্দিষ্ট কোনো দক্ষতা অর্জন করেন বা প্রশিক্ষণ নিয়ে আসেন, যা তাদের শ্রমবাজারে তুলনামূলক ভালো অবস্থান তৈরি করতে সহায়তা করে।

প্রবাসীদের একটি অংশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সৌদি আরবে বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা সাধারণত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা বিবেচনা করে পেশা নির্বাচন করেন। যেমন, ফিলিপাইনের অনেক কর্মী অফিস সহকারী, প্রশাসনিক সহায়তা, আতিথেয়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও গ্রাহকসেবাসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা (বলদিয়া) এবং সড়কের পাশে অননুমোদিতভাবে ফুটপাতে ব্যবসা করার মতো পেশায় বেশি দেখা যায়। এমন মন্তব্য প্রবাসী সমাজের একটি অংশের মধ্যে প্রচলিত। তবে এটি সব বাংলাদেশি প্রবাসীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; সৌদি আরবে অসংখ্য বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ার , চিকিৎসক, শিক্ষক, আইটি পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, চালক, কারিগর ও বিভিন্ন দক্ষ পেশায়ও সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন।

বলদিয়া বা পৌর পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ সৌদি আরবে একটি বৈধ সরকারি বা পৌরসভার অধীনস্থ পেশা। এই পেশায় নিয়োজিত শ্রমিকরা শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে প্রবাসীদের একটি অংশের মতে, এই পেশার সামাজিক মর্যাদা নিয়ে অনেক বাংলাদেশির মধ্যে দ্বিধা রয়েছে এবং তারা মনে করেন, দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তুলনামূলক ভালো বেতন, পদোন্নতির সুযোগ ও অধিক সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন পেশায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। অন্যদিকে, সড়ক বা ফুটপাতে অনুমতি ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা সৌদি আরবের আইন অনুযায়ী অবৈধ এবং এর জন্য জরিমানা, পণ্য জব্দ, এমনকি আইনগত ব্যবস্থার মুখোমুখিও হতে পারে।

রিয়াদে অবস্থানরত কয়েকজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে , প্রায় পাঁচ দশক ধরে সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার হলেও দেশের অনেক দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মী এখনো তাদের প্রকৃত যোগ্যতার স্বীকৃতি পান না।

তারা আরও বলেন, সৌদি আরবে বর্তমানে অসংখ্য বাংলাদেশি প্রকৌশলী, চিকিৎসক, আইটি পেশাজীবী, দক্ষ চালক, কারিগর, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন খাতে সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। তাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে আরও শক্তিশালী করতে বিদেশগামী কর্মীদের কারিগরি দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান ও পেশাগত প্রশিক্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!