দৃষ্টিনন্দন বাংলাদেশের এমন কিছু জায়গা আছে যা তেমন পরিচিতি লাভ করেনি। এমনই এক জায়গা চাকঢালা সোনালি ঝর্ণা আর আশারতলি চা-বাগান। ধীরে ধীরে এই জায়গাগুলো পর্যটকদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। বৃষ্টিমুখর দিনে এই স্পটে প্রতি বছর পার্শ্ববর্তী এলাকার আর স্থানীয় বাসিন্দাদের ভিড় থাকে। যেখানে পাহাড় ছুঁয়ে যায় মেঘ, মেঘ ছুঁয়ে যায় হৃদয়। যেখানে ঝর্ণাধারার কলকল ধ্বনি কানে বাজে কোমলমতি মেয়ের নূপুর তালে। হাত বাড়ালেই বন, উপবন, ছুঁয়া যায় বর্ষা রানির শীতল ধারা। সবুজে ঢাকা চা-বাগান। এমনই এক অনন্য অনুভূতির মুখোমুখি হবেন পুরো ভ্রমণজুড়ে।
যাত্রা
কক্সবাজারের রামু শহর থেকে সিএনজি করে ২০ কিলো পথ অতিক্রম করে বান্দরবান জেলার নাইক্ষংছড়ি উপজেলা হয়ে চাকঢালা গ্রামে পৌঁছাতে হবে। অবশ্য এই আঁকাবাঁকা পথ, উঁচু নিচু পাহাড়, গ্রামে সবুজ প্রকৃতি আপনাকে যাত্রাপথেই মুগ্ধ করবে। চাকঢালা গ্রামের প্রধান পয়েন্ট হতে দুই, আড়াই কিলো পথ হেঁটে অতিক্রম করতে হবে। পাহাড়ি গ্রামের বাহারি বৃক্ষে অনুভব হবে এটা গ্রাম নয়, একটি সুনশান গহিন অরণ্যে নীরবে হাঁটছেন। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে হাঁটছেন অগণিত পাহাড়ের মুকুট দেখে দেখে, যে মুকুট ছুঁয়ে যায় সাদা মেঘ । পাহাড়ের ভাজে ভাজে গড়ে উঠেছে কয়েক টুকরো সোনার জীবন । ছোট ছোট কুটিরেই বসবাস করছে প্রায়ই অর্ধশত পরিবার। চোখধাঁধানো এমন দৃশ্য দেখে নিজেকেই অবিশ্বাস্য মনে হবে। পাহাড়ের বুক চিরে পিচ্ছিল পথ, কখনো ছোট ছোট খালের পাথরের ওপর হাঁটার অনুভূতি আপনার যাত্রাকে রূপ দেবে একটি সফল অ্যাডভেঞ্চারে।
ঝর্ণার প্রথম দর্শন
পায়ের পাতা-ডুবা পানিতে পাথরের ওপর পা ফেলে ফেলে আসতেই কানে বাজবে অবিরাম জলধ্বনি, বাঁক ফিরতেই পানির অণুকণা ধোঁয়ার রূপ নিয়ে চারদিকে উড়ছে! পাহাড়ের প্রায়ই একশো চল্লিশ ফুট উপর থেকে অবিরাম গড়িয়ে পড়ছে জল। জলের গর্জন আর ছিটকে আসা অণুকণায় সৃষ্ট ধোঁয়া, চারিদিকে মোড়ানো পাহাড়ের মাঝখানে প্রথম দেখাতেই মনে এক অজানা ভয় তৈরি হবে। কিন্তু আস্তে আস্তে এই ভয় কেটে গিয়ে মনে নতুন এক আগ্রহ ও আনন্দ তৈরি হবে। আর এই ভয় আপনাকে অনুভূতি জাগাবে ঝর্ণার আকার এবং সৌন্দর্য কতটুকু ।
ঝর্ণায় কাটানো সময়
ঝর্ণার স্পট অত্যন্ত সুন্দর ও প্রশস্ত হওয়ায় আনন্দের সঙ্গে গোসল করা যায়। আমরাও এর ব্যতিক্রম করিনি। ঝর্ণার ঢালু স্থানে কিছুটা উপরে উঠে নিচের জলে লাফ দিয়ে দারুণ উদযাপন করেছিলাম। এই ঝর্ণায় নিচে কোনো পাথর না থাকায় আমরা সাহসিকতার সঙ্গে লাফ দিয়েছি। অবশ্য এই লাফ আমাদের আনন্দকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ঝর্ণার পাশে পাহাড়ের ঢালে পাওয়া যায় বিভিন্ন ফল, ফুলের গাছ। আমরা একটি কাঁঠাল গাছ থেকে দুটি পাকা কাঁঠাল নিয়েছিলাম। অনন্য এই দৃশ্য আমাদের প্রতিটি মুহূর্তকে মুগ্ধ করেছে।
ভ্রমণের চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি
ঝর্ণায় যাওয়ার পথটি লোকালয়ের মধ্য দিয়ে হওয়ায় অনেকটা ঝুঁকি কম। তবে পাহাড়ের ঢালু রাস্তায় অত্যন্ত সতর্ক থাকা জরুরি। পিচ্ছিল পথে ধীরে হাঁটতে হবে। ঢালু বেয়ে হাঁটার সময় ভূমিধসের সম্ভাবনা থাকায় সাবধানে এগোতে হবে। পাহাড়ে জোঁক বেশি, তাই সবসময় পায়ের দিকে নজর রাখতে হবে। ঝর্ণায় অতিরিক্ত পানির কারণে বেশি উঁচু থেকে লাফ দেওয়া মোটেও উচিত নয়। ঠান্ডা পানিতে বেশিক্ষণ গোসল করা ঠিক হবে না। তাই পিচ্ছিল পথ, ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অহশষব ইধহফ (অ্যাঙ্কল ব্যান্ড ), শুকনো কাপড় ও পর্যাপ্ত খাবার নিয়ে যেতে হবে।
চা-বাগানে প্রবেশ
ঝর্ণার দর্শন শেষ করে আবার পাঁচ/ছয় কিলো পথ অতিক্রম করেই আশারতলি চা-বাগান। যাওয়ার পথটি যেন পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি হয়েছে। চারদিকে সবুজ অরণ্যের মাঝ দিয়ে এই পথ আপনার যাত্রাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে। চা-বাগানের ভেতরে প্রবেশ করতেই মনে হবে এক টুকরো সিলেট। পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত খাঁজকাটা ও দারুণ শৈল্পিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে চা-গাছের সারি। দীর্ঘ এলাকাজুড়ে এই বাগান যে কারো মনকে ছুঁয়ে দিতে সক্ষম। বাগানের একপর্যায়ে নতুন করে লেবু বাগানের শুরু। এক পাশে চা-বাগান একপাশে লেবু বাগান দারুণ আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় মানুষ ও জীবন
এই স্থানের মানুষগুলো অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থানে বসবাস করে জীবনযাপন করে । নানারকম প্রতিকূল অবস্থানে বেড়ে ওঠা এই মানুষগুলো অনেক সরল ও ভালো মনের। যাতায়াত সমস্যা ও দুর্বল নেটওয়ার্ক স্থানীয়দের প্রধান বাধা। সুষ্ঠু যাতায়াতের কারণে এই অঞ্চলের মানুষ এখনো উন্নতির ধারে পৌঁছাতে পারছে না। কিন্তু তাদের বন্ধুসুলভ আচরণ মনে হবে তারা শিষ্টাচারে উন্নতির একধাপ এগিয়ে। স্থানীয়দের মাঝে দারুণ সম্প্রীতি বজায় আছে। এখানে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস থাকলেও চাক জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । তাছাড়া চাক, মারমা, ম্রো (মুরং), চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বসবাস করেন।
শেখা ও উপলব্ধি
এই ভ্রমণ যেন জীবনেরও এক মূল্যবান পাঠ। এখানকার মানুষের কাছ থেকে শেখা যায় অল্পে তুষ্ট থাকার মানসিকতা, আন্তরিকতা, অতিথিপরায়ণতা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি। দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশেও কীভাবে কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য ও সংগ্রামের মাধ্যমে জীবনকে এগিয়ে নেওয়া যায়, তা তাদের প্রতিদিনের জীবনই শেখায়। একই সঙ্গে প্রকৃতিকে ভালোবাসা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ভ্রমণে দায়িত্বশীল আচরণের গুরুত্বও এই যাত্রা উপলব্ধি করায়।
একনজরে ভ্রমণতথ্য
অবস্থানÑ সোনালি ঝর্ণা ও আশারতলি চা-বাগান, চাকঢালা, নাইক্ষ্যংছড়ি, বান্দরবান।
মৌসুমÑ বর্ষাকাল (জুন-সেপ্টেম্বর) ঝর্ণা
সবচেয়ে প্রাণবন্ত থাকে। তবে ভারি বৃষ্টিতে সতর্কতা জরুরি।
উপকরণÑ ট্রেকিং উপযোগী জুতা, অ্যাঙ্কল ব্যান্ড (প্রয়োজনে), শুকনো কাপড়, পানীয় জল, হালকা খাবার, ফার্স্ট-এইড, বৃষ্টির পোশাক ও পলিথিনে মোড়ানো মোবাইল/ক্যামেরা।
স্থানীয় গাইডÑ প্রথমবার গেলে স্থানীয় গাইড সঙ্গে নেওয়া নিরাপদ
পুরো ভ্রমণের জন্য একদিন যথেষ্ট।
প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য, পাহাড়ি মানুষের আন্তরিকতা আর দুঃসাহসিক ভ্রমণের অনন্য সমন্বয় চাকঢালার সোনালি ঝর্ণা ও আশারতলি চা-বাগান। একবার ঘুরে এলে স্মৃতির পাতায় এই ভ্রমণ দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন