মানবজীবনের আধ্যাত্মিক যাত্রায় গভীর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা প্রায়শই মানুষকে স্থবির করে রাখে। আমাদের মধ্যে অনেকেই অবচেতনভাবে একটি মারাত্মক বিভ্রান্তিকর মানসিকতার ওপর ভর করে জীবন পরিচালনা করি। আমরা মনে করি, ‘আমার অন্তরে এখন ইমানের সেই তেজ বা আধ্যাত্মিক অনুভূতি নেই; আগে হৃদয়ে ইমানের সেই স্বাদ ও শক্তি ফিরে আসুক, তারপর নিয়মিত সালাত শুরু করব কিংবা অধর্ম ও পাপের পথ বর্জন করব।’ এই অলীক অনুভূতির অপেক্ষায় থেকে আমরা প্রতিদিনের আত্মিক ও নৈতিক জীবনকে পুরোপুরি অনিয়ন্ত্রিত ও বিশৃঙ্খল হতে দিই। নিজেদের এই আলস্য ও স্থবিরতার দায়ে পরিস্থিতি, ভাগ্য কিংবা অনুকূল পরিবেশের অভাবকে দোষারোপ করতে থাকি। তবে পবিত্র কোরআনের একটি মাত্র আয়াত মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক অজুহাত ও অবাস্তব ধারণাকে এক নিমিষে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। ড. ইয়াসির ক্বাদির গভীর তাত্ত্বিক পর্যালোচনার আলোকে সুরা আনকাবুতের সেই সুমহান শেষ আয়াতের প্রজ্ঞা মানবজাতির সামনে হেদায়েত ও ইবাদতের পরম মিষ্টতা অর্জনের শাশ্বত রাজপথ উন্মোচন করে।
পবিত্র কোরআনের সুরা আনকাবুতের ৬৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এর অসামান্য ও চূড়ান্ত সমাধান উপস্থাপন করেছেন। কালজয়ী মুফাসসির ইবনে কাসিরসহ (রহ.) অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যাখ্যাকারগণ উল্লেখ করেছেন যে, এটি পবিত্র কোরআনের অন্যতম সংক্ষিপ্ত অথচ সর্বাধিক ব্যাপক ও গভীর অর্থবহ আয়াতগুলোর একটি। আয়াতটিতে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘আর যারা আমার উদ্দেশ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায় বা সংগ্রাম করে, আমি অবশ্যই তাদের জন্য আমার হেদায়েত ও সফলতার পথগুলো উন্মুক্ত করে দেব; আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণ বা ইহসানের অধিকারীদের সঙ্গেই রয়েছেন।’ এই ঐশী বাণীর মূল নির্যাস হলো, আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের সূচনা হতে হবে মানুষের নিজের সদিচ্ছা ও প্রত্যক্ষ উদ্যোগের মাধ্যমে। জীবনের নৈতিক রূপান্তরের দায়ভার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইসলামের দর্শনে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। আয়াতটি স্পষ্ট করে দেয় যে, পরম করুণাময় শুরুতেই বান্দার কাছে নিখুঁত বা ভুলত্রুটিহীন আমল দাবি করছেন না; তিনি দেখতে চান বান্দার আন্তরিক চেষ্টা ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধতা।
কোরআনের এই চিরন্তন সূক্ষ্মতায় লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মহান আল্লাহ কিন্তু বলেননি যে যারা ইবাদতকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছে বা ইমানের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেছে, কেবল তাদেরই সাহায্য করা হবে। বরং তিনি অতি চমৎকারভাবে ‘জাহাদু’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যা চূড়ান্ত আত্মসংগ্রাম, মেহনত ও অন্তহীন প্রচেষ্টাকে নির্দেশ করে। ভোরে নিদ্রার গভীর আকর্ষণ ত্যাগ করে ফজরের নামাজের জন্য শয্যা ত্যাগের কষ্টই হলো বান্দার প্রাথমিক আত্মসংগ্রাম। অলসতা ও অনীহাকে দূরে ঠেলে সালাতে দাঁড়িয়ে যাওয়া, অবৈধ উপার্জন কিংবা কুদৃষ্টির প্রলোভন থেকে নফস বা কুপ্রবৃত্তিকে সংযত রাখা, মেজাজ ও রাগকে হুকুমের অধীনে আনা, নিয়মিত জিকির বজায় রাখা এবং পারিবারিক জীবনে একজন সৎ ও দায়িত্বশীল অভিভাবক হওয়ার নিরন্তর প্রক্রিয়াই হলো বান্দার ভেতরের আসল ‘জিহাদ’। মহান রব বান্দার কাছে শুধু এই সত্যতা ও সিরিয়াসনেসটুকু দেখতে চান যে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্ষণিক আরাম ও নফসের প্ররোচনা ত্যাগ করতে প্রস্তুত কি না।
আয়াতটির প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যাকরণগত ব্যাকগ্রাউন্ড পর্যালোচনা করলে আরও একটি অপূর্ব রহস্য উন্মোচিত হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কিন্তু বলেননি যে যারা ‘আমার দ্বীনের পথের জন্য’ চেষ্টা করে, বরং ব্যাকরণগতভাবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেনÑ যারা ‘আমার সন্তুষ্টির জন্য’ (ফি-না) আত্মত্যাগ করে। কারণ, পথ তো পরিশেষে আল্লাহর দিকেই ধাবিত হয়, কিন্তু আল্লাহ দেখতে চান বান্দার নিয়তের বিশুদ্ধতা। যখন একজন মানুষ কেবল স্বীয় স্রষ্টাকে সন্তুষ্ট করার মানসে এই মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক লড়াইটা শুরু করে, তখনই তার আধ্যাত্মিক বিপ্লবের সূচনা ঘটে। আরবি ব্যাকরণের সুদৃঢ় জোরালো বাক্যরীতি অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালা নিশ্চায়তা দিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, বান্দা যদি তাঁর দিকে এক কদম বাড়ায়, তবে তিনি তার জন্য কেবল একটি নয়, বরং সফলতা, হেদায়েত ও আত্মিক প্রশান্তির অগণিত তোরণ উন্মুক্ত করে দেবেন। বান্দা যখন রবের সন্তুষ্টির জন্য সামান্য একটি সৎকাজের উদ্যোগ নেয়, তখন তার চারপাশে আরও বহু কল্যাণকর কর্মের দ্বার স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায়।
ইসলামের এই চিরন্তন ব্যাকরণ মনস্তত্ত্বের এক পরম সত্যকে উন্মোচিত করেÑ আল্লাহ তায়ালা পরিস্থিতিকে তখনই সহজ ও অনুকূল বানান, যখন বান্দা নিজে থেকে প্রথম পদক্ষেপটি গ্রহণ করে। আধ্যাত্মিক যাত্রায় সফল হওয়ার জন্য সূচনাতেই নিখুঁত হওয়া বা রেসের শেষ প্রান্তে পৌঁছানো শর্ত নয়; শর্ত হলো আন্তরিকভাবে রেসে অংশগ্রহণ করা ও যাত্রা শুরু করা। আমরা প্রায়শই অভিযোগ করি যে, ইবাদতে মন বসে না, আল্লাহর সান্নিধ্য অনুভব করা যায় না। এর মূল কারণ হলো, আমরা নিজেদের কুপ প্রবৃত্তি ও কুঅভ্যাসের বিরুদ্ধে লড়াইটা কখনোই শুরু করিনি। বান্দা যখন নিজের ত্যাগের মাধ্যমে লড়াইয়ের চাকাটি সচল করে, তখনই ইমানের আসল স্বাদ ও মিষ্টতা অন্তরে অনুভূত হতে শুরু করে এবং চারপাশ থেকে ঐশী রহমতের স্পর্শ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ, নিশ্চয়ই পরম করুণাময় পরম নিষ্ঠাবান ও ইহসানের অধিকারীদের সঙ্গ পরিত্যাগ করেন না।
এই মহান আয়াতের প্রাসঙ্গিকতা বুঝতে হলে সুরা আনকাবুতের সার্বিক প্রেক্ষাপট ও কাঠামোর দিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। পুরো সুরাটি যদি পাঠ করা হয়, তবে দেখা যাবে এর একদম সূচনাতেই আল্লাহ তাআলা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেনÑ মানুষ কি মনে করে যে ‘আমরা ইমান এনেছি’ এ কথা বললেই তাদের পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া হবে? বস্তুত, সমগ্র সুরা আনকাবুত জুড়ে মানুষের জীবনের নানা ফিতনা ও কঠিন পরীক্ষার বিবরণ ছড়িয়ে রয়েছে। ইমান রক্ষা করতে গিয়ে নবীদের ওপর নেমে আসা পাশবিক নির্যাতন, দ্বীন রক্ষার স্বার্থে ইব্রাহিম ও লুত (আ.)-এর হিজরত, সম্পদের মোহ, ক্ষমতার দম্ভ, পরিজন ও পিতা-মাতার সন্তুষ্টি বিধানের মতো জটিল পরীক্ষার সবিস্তার আলোচনা রয়েছে এই সুরায়। জীবনের এতসব জটিল ফিতনা ও মনস্তাত্ত্বিক ঝড়ের আবর্তে পড়ে মানুষ কীভাবে টিকে থাকবে এবং কীভাবে ইমানের দীপশিখা জ্বালিয়ে রাখবেÑ পুরো সুরার এই চূড়ান্ত প্রশ্নের এক মহা-উত্তর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এর শেষ আয়াতটি। উত্তরটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট: মানুষকে কেবল লড়াইয়ের সংকল্প নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হবে; বাকি সহজীকরণ ও সাহায্য অলৌকিক উপায়ে আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসবে।
অতএব, ইমান ও ইবাদতের মিষ্টতা অর্জনের জন্য নিজের আলস্য, গুনাহ কিংবা অলস মানসিকতার দায় অন্য কোনো কিছুর ওপর চাপানো বন্ধ করাই হলো প্রকৃত প্রজ্ঞার পরিচয়। রূপান্তর ও বিপ্লব সর্বদা মানুষের ভেতরের জগত থেকে শুরু হতে হবে। আজই নিজের নফসের বিরুদ্ধে, কুঅভ্যাসের বিরুদ্ধে এবং অলসতার বিরুদ্ধে সেই পরম আত্মসংগ্রামের সূচনা করতে হবে। মানুষ যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের ক্ষুদ্রতম ত্যাগ ও প্রচেষ্টাকে পেশ করবে, তখন মহান রব তাঁর অসীম অনুকম্পায় রহমত ও সফলতার শত সহস্র দুয়ার উন্মুক্ত করে দেবেন। পৃথিবীর যাবতীয় ফিতনা, মানসিক অস্থিরতা ও শূন্যতা থেকে বেঁচে থাকার এটিই একমাত্র শাশ্বত রাজপথ। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে প্রবৃত্তি দমনের তৌফিক দান করুন, আমাদের আত্মিক প্রচেষ্টাকে কবুল করুন এবং তাঁর দরবারের সুমহান হেদায়েত ও শান্তির চাদরে আমাদের জড়িয়ে রাখুন। আমিন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন