বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সিরাজগঞ্জ শিল্প পার্কের নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। এসব ভয়াবহ অভিযোগের বিরুদ্ধে তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে দীর্ঘ ১৬ মাস পেরিয়ে গেলেও সেই তদন্ত আজও শেষ হয়নি। তদন্তকাজ কচ্ছপ গতিতে চলায় এবং দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়ে ঢাকা-পাবনা মহাসড়ক সংলগ্ন প্রায় ৪০০ একর জমিতে বিসিক শিল্প পার্কটি নির্মাণ করা হয়েছে। গত বছরের ৬ মার্চ দুদক এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের একটি দল শিল্প পার্কে ঝটিকা অভিযান চালায়। মূলত পার্কের ৪০ শতাংশ কাজ অসম্পন্ন রেখেই শতভাগ বিল উত্তোলন করে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই অভিযান চালানো হয়। সে সময় বিসিক জেলা কার্যালয় থেকে বিভিন্ন রেকর্ডপত্র সংগ্রহ ও সরেজমিন পরিদর্শন করে দুদক টিম। তবে দীর্ঘ দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখতে পায়নি এলাকাবাসী।
প্রায় ৭১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই মেগা প্রকল্পে রাস্তা, ড্রেন ও অবকাঠামো নির্মাণে শুরু থেকেই ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্যবহারের আগেই শত কোটি টাকার নবনির্মিত রাস্তার কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে। কোথাও পাথরের বদলে নি¤œমানের খোয়া, আবার কোথাও অর্ধাংশ ইট ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া টেন্ডার শর্ত অনুযায়ী কার্পেটিংয়ের নির্দিষ্ট পুরুত্বও বজায় রাখা হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরাফাত কনস্ট্রাকশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজের মান ঠিক না রেখেই সম্পূর্ণ বিল তুলে নেয়। এতে তৎকালীন প্রকৌশল বিভাগের পরিচালক আব্দুল মতিন ও প্রকল্প পরিচালক জাফর বায়েজিদের সরাসরি যোগসাজশ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত বিসিক চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এমনকি গত বছর ১৬ আগস্ট পরিচালক আব্দুল মতিন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে এলেও রাস্তার কোনো পরিমাপ না নিয়েই দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। বিসিকের একটি গোপন সূত্র জানায়, মূলত ঠিকাদারের নিরাপত্তা জামানত ছাড়ের পথ সুগম করতেই ওই আইওয়াশ পরিদর্শন করা হয়েছিল।
এদিকে, ২০২০-২১ অর্থবছরে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করায় ড্রেন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান খান এবং রাস্তা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্স লিমিটেডকে প্রায় ২০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, দীর্ঘ সময় পার হলেও আজ পর্যন্ত সেই জরিমানার একটি টাকাও আদায় করতে পারেনি বিসিক কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, প্রকল্প সমাপ্তির দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আজও প্লটে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো মৌলিক সংযোগ নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে বরাদ্দ পাওয়ার এক বছর পার হয়ে গেলেও কোনো শিল্প মালিক সেখানে কারখানা স্থাপন করতে পারেননি।
তথ্য অধিকার আইনে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে তথ্য জানতে চেয়ে আবেদন করা হলে, ব্যবসায়িক গোপনীয়তার অবাস্তব অজুহাত দেখিয়ে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান বিসিক শিল্পনগরীর ব্যবস্থাপক মাহবুবুল ইসলাম।
তদন্তের এই দীর্ঘসূত্রতা এবং কাজের ধীরগতি নিয়ে জানতে চাইলে পাবনা আঞ্চলিক দুদক কর্মকর্তা শহিদুল আলম জানান, প্রাথমিক পরিদর্শনের পর ঢাকা দুদক কার্যালয় থেকে অধিকতর অনুসন্ধানের অনুমতি নিতেই দীর্ঘ সময় চলে যায়। দপ্তরে তীব্র লোকবল সংকট এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পাওয়ার কারণে কাজ শেষ করতে বিলম্ব হচ্ছে। হেডকোয়ার্টারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা মেনেই তারা কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন।
এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্প পার্কের অনিয়ম সংক্রান্ত একাধিক রিপোর্ট ইতোমধ্যে তাদের হাতে এসেছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন