অভিশপ্ত ভবদহ অঞ্চলে ফের ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। যশোর ও খুলনা জেলার দুই শতাধিক গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বর্তমানে কয়েক লাখ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হওয়ায় দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে সেনাবাহিনীর নদী খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন সত্ত্বেও লাখো মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি মাসের অবিরাম বর্ষণে ভবদহ অঞ্চলে আবারো জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। যশোরের মণিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর এবং খুলনার ডুমুরিয়ার দুই শতাধিক গ্রাম এখন হাঁটু থেকে কোমরপানির নিচে। পানির নিচে ভিটামাটি, স্কুল-কলেজ, মন্দির-মসজিদ এবং শত শত বিঘার ফসল ও মাছের ঘের। অভয়নগরের ডহর মশিয়াহাটি, ডুমুরতলা, আন্দা, বলারাবাদ, বেদভিটা, চলিশিয়া, দিঘলিয়া, কপালিয়া ও দত্তগাতী এবং মণিরামপুরের হাটগাছা, নেবুগাতি, পাঁচকাটিয়া, কুলটিয়া, লখাইডাঙ্গা, মহিষদিয়া, আলীপুরসহ বহু গ্রামের ঘরে ঘরে এখন থৈ থৈ পানি। যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। ডুমুরতলা-বেদভিটা রোড, বলারাবাদ রোড, আন্দা-ডুমুরতলা রোডসহ মশিয়াহাটি-সুন্দলী সড়কের অন্তত ১০টি স্থান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
সূত্র জানায়, ভবদহের অভিশাপ থেকে অঞ্চলটিকে রক্ষা করতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১.৫ কিলোমিটারজুড়ে পাঁচটি নদী (হরিহর, হরি-তেলিগাতি, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদী) পুনর্খননের কাজ শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা। কিন্তু নদী খনন প্রায় শেষ পর্যায়ে এলেও এর কার্যকারিতা শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে। বর্তমানে ভবদহ সুইফটগেটে চারটি পাম্প সচল রাখা হলেও কপাটগুলো ঠিকমতো ওঠানামা করছে না।
অভয়নগর উপজেলার ডুমুরতলা গ্রামের শিক্ষক শিবপদ বিশ্বাস জানান, গ্রামের দেড় শতাধিক পরিবারের উঠানে দুই থেকে তিন ফুট পানি জমেছে। সামান্য বৃষ্টি বাড়লেই ভিটামাটি ছেড়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকবে না। মণিরামপুরের হরিদাশকাটি ইউনিয়নের বাসিন্দারা জানান, ইউনিয়নের ২২টি গ্রামের অধিকাংশেরই বসতবাড়িতে পানি ঢুকে নিত্যদিনের জীবনযাত্রা স্থবির করে দিয়েছে।
এদিকে স্থায়ী সমাধানের দাবিতে গতকাল রোববার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি। স্মারকলিপিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দীর্ঘসূত্রতা ও গাফিলতিকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। জেলা প্রশাসকের পক্ষে স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুজন সরকার।
স্মারকলিপিতে জলাবদ্ধতা নিরসনে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ও দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের কার্যাদেশ দেওয়ার দুই বছর পার হলেও নানা অজুহাতে কাজ আটকে থাকা, যা দিয়ে অন্তত ২৫ শতাংশ পানি নিষ্কাশন সম্ভব হতো। এ ছাড়া ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদী খনন করা হলেও খর্ণিয়া ব্রিজের দক্ষিণ পাশে বাঁধ দিয়ে তা ঠিকমতো অপসারণ না করায় কুলবাড়িয়া পর্যন্ত সাত কিলোমিটার নদী পুনরায় পলি ভরাট হয়ে গেছে। সমীক্ষায় ৯৭ শতাংশ মানুষ জোড়াধার বা টিআরএমের (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) পক্ষে মতামত দিলেও তা নদী খননের সঙ্গে যুগপৎভাবে চালু করা হচ্ছে না। স্মারকলিপিতে অবিলম্বে আমডাঙ্গা খালের কাজ শেষ করা, খর্ণিয়া বাঁধসহ সব আড় বাঁধ তুলে পলি অপসারণ করা, টিআরএম বাস্তবায়ন এবং পানিবন্দি মানুষের জন্য জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার চার দফা দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপি প্রদান শেষে ডিসি অফিস চত্বরে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, অবিলম্বে পানি অপসারণ ও সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী ৩ আগস্ট যশোর জেলা প্রশাসক কার্যালয় চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে।
তিনি আরও জানান, নদী খনন আর টিআরএম যুগপৎভাবে না করলে নদী কাটার সব অর্থই জলে যাবে। খর্ণিয়া ব্রিজের কাছে বাঁধের কারণে নদী ভরাট হয়ে গেছে। বিলে জোয়ারধার চালু করে নদীর প্রাকৃতিক গতিপথ ফিরিয়ে না আনলে এই জলাবদ্ধতা যন্ত্রণা থেকে সহসা মুক্তি মিলবে না।
এ বিষয়ে যশোর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জী জানান, সেনাবাহিনীর নদী খননে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। কপাটগুলো সচল রয়েছে এবং চারটি পাম্প চালু রেখে পানি নামানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। জলাবদ্ধ এলাকাগুলো প্রতিনিয়ত পরিদর্শন করা হচ্ছে। মূলত বিলের নিচু এলাকার কিছু ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত কাজ চলছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন