আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সারা দেশে নেমে এসেছে এক অজানা আশঙ্কা। আতঙ্কে আছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে যারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত তাদের আশঙ্কা কয়েক গুণ বেশি। আর নির্বাচনে যারা প্রার্থী হয়েছেন বা হতে চাচ্ছেন তারা রীতিমতো জীবননাশের আশঙ্কায় আছেন।
ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে এই আতঙ্কে ছেয়ে গেছে পুরো দেশ। আশঙ্কা আর আতঙ্কে আছেন খোদ সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সাথে সম্পৃক্ত সদস্যরাও। আশঙ্কা সাম্প্রতিক সময়গুলোতে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্ত হওয়া, আর চারপাশের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানি নিয়ে।
আরেকটি কারণ, জুলাই আন্দোলনে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ উদ্ধার না হওয়া, যেগুলো চলে গেছে সন্ত্রাসীদের হাতে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ থেকে অস্ত্রের অনুপ্রবেশও ঘটছে। সব মিলিয়ে একটা ভয়াবহ অবস্থা বা পরিস্থিতির দিকে ছুটে চলছে দেশ। চোরাগোপ্তা হামলা, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও নাশকতার আশঙ্কা আরও প্রবল হচ্ছে।
এসব নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় দফায় দফায় বৈঠক করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সাথে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের সাথে। নিচ্ছে নানান কর্মসূচি। কিন্তু এরপরও একটা অজানা আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। পুলিশ এবং সরকারের একাধিক মহলের সাথে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে গতকাল রোববার টেলিফোনে বলেন, মূলত যা ঘটছে বা আরও যা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা সবই নির্বাচনকে ঘিরে। একটি মহল চায়, যাতে নির্বাচন না হয় কিংবা পিছিয়ে যায়। আর এই চক্রের সাথে কাজ করছে একাধিক বিদেশি চক্র।
এরা ইতিমধ্যেই ভাড়া করতে শুরু করেছে ঢাকাসহ সারা দেশের চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের। এই সন্ত্রাসীরা ফুটবল বা ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের মতো এখন দলবদল করছে। যে গোষ্ঠী বা চক্র বেশি টাকা আর নিরাপত্তা দেবে, তারা সেদিকেই ভিড়ছে। তাদের দিয়েই এই চক্র নির্বাচন বানচালসহ সব ধরনের ফায়দা লুটতে চায়। লুকিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের একটি অংশও এই অপতৎপরতার সাথে জড়িত।
কর্মকর্তা আরও বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে এই চক্র যানবাহন এবং নির্বাচনি কাজে ব্যবহৃত হওয়া স্থাপনাতেও অগ্নিসংযোগ করে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করতে পারে।
তিনি আরও জানান, মাঠ পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ইতিমধ্যেই অধিকতর সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। গত শনিবার রাতে পুলিশের মহাপরিদর্শকের সঙ্গে দেশের সব বিভাগের রেঞ্জ ডিআইজি এবং পুলিশের কমিশনারদের বৈঠকেও এ-সংক্রান্ত আলোচনা হয়। সার্বিক পরিস্থিতি এবং করণীয় নিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাতেও গত শনিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির বৈঠক হয়।
পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তাদের এখন বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং অস্ত্র উদ্ধার। সীমান্ত এলাকাতেও কড়া নজরদারি করা হচ্ছে, যাতে করে, আগ্নেয়াস্ত্র আর ভারতে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা দেশে ঢুকতে না পারে। সাদা পোশাকের পুলিশকে বেশি করে মাঠে নামানো আর গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর কথাও ভাবছেন তারা। সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার এবং অস্ত্র উদ্ধারে শিগগিরই মাঠে নামবে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২।
প্রধান চিন্তা : অস্ত্র আর জামিনে মুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী
আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠকে এবং উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য এবং আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের জরুরি বৈঠকে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার আর অবৈধ পথে সীমান্ত পারাপার বন্ধে নজরদারি বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র ছিল এবং সেগুলোর মধ্যে যেগুলো জমা পড়েনি, সেগুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে বৈঠকে।
ইতিমধ্যেই অবৈধ অস্ত্রের রুটগুলো চিহ্নিত করা এবং অর্থের জোগানদাতাদের শনাক্তে কাজ শুরু করেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত হারিয়ে যাওয়া ১ হাজার ৩৩৭টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এর মধ্যে ৪০০টির মতো পিস্তলও আছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং জামিনে মুক্ত হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করার দাবি এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও।
পুলিশের তৎপরতায় দুর্বলতার কারণে একের পর এক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১৭৪ জন হাই-প্রোফাইল বন্দিকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। এদের মধ্যে ছয়জন শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাদের বেশির ভাগই এক থেকে দেড় যুগের বেশি সময় ধরে কারাগারে ছিলেন। এখন তারা আবার বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। আশঙ্কা, এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হতে পারে। অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী আবার কারাগারে থেকেও অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন।
ইতিমধ্যে জামিনে মুক্ত হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে রয়েছে ‘কিলার আব্বাস’ হিসেবে পরিচিত মিরপুরের আব্বাস আলী, তেজগাঁওয়ের শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, মোহাম্মদপুরের ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, হাজারীবাগ এলাকার সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন ও খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘জামিনে বের হয়ে কেউ যেন নতুন করে অপরাধমূলক কাজে জড়াতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি থাকবে। শীর্ষ সন্ত্রাসী, গডফাদার বা যেকোনো পরিচয়েই হোক, অপরাধ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কারাগারে থেকেই বাইরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করত। তাই জামিনে মুক্ত হলে তাদের অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়। জামিনে এসে সন্ত্রাসীরা আবার পুরোনো অপরাধের নেটওয়ার্ক সচল করছে কি না, সে বিষয়ে কঠোর নজদারি করা প্রয়োজন।’
আরেক অপরাধ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে চট্টগ্রাম, পাবনা ও লক্ষ্মীপুরে সংঘটিত কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। সব মিলিয়ে, নির্বাচন সামনে রেখে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের এই সক্রিয়তা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে, যা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক বলেন, ‘নির্বাচনের আগে-পরে প্রশাসনিক ব্যস্ততা, রাজনৈতিক সমাবেশের ভিড় এবং মামলা পরিচালনার ধীরগতিকে অনেক অপরাধী ‘সুযোগের জানালা’ হিসেবে দেখে। জামিনে মুক্ত অবস্থায় কেউ কেউ এলাকায় শক্তি প্রদর্শন, হুমকি, চাঁদাবাজি কিংবা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভয় তৈরি হয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মাঠ পর্যায়ের কাজ ব্যাহত হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘জামিন সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু জামিন পাওয়া ব্যক্তিরা শর্ত ভঙ্গ করে কার্যত নজরদারির বাইরে থেকে যায়। আদালত সাধারণত জামিনের শর্ত দেন এলাকা ত্যাগ না করা, সাক্ষীদের প্রভাবিত না করা, নিয়মিত হাজিরা দেওয়া। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সেই শর্ত বাস্তবায়ন হয় না। শর্ত বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ দুর্বল হলে অপব্যবহারের ঝুঁকি থাকে।’
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা অপরাধীদের সাহস জোগায় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘প্রার্থী মনোনয়ন, প্রচারণা ও মাঠ পর্যায়ে ‘শক্তি’ ব্যবহারের সংস্কৃতি বন্ধ না হলে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা কমানো কঠিন। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ শুদ্ধাচার ও প্রার্থী বাছাইয়ে কঠোরতা জরুরি। নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব হলেও জামিনে মুক্ত অপরাধীদের প্রভাব সেই উৎসবকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। আইন, রাজনীতি ও প্রশাসনের সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপই পারে ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। অন্যথায় ভয় ও প্রভাবের রাজনীতি অব্যাহত থাকবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতন্ত্র।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু করতে যা যা করা দরকার, করা হবে। নির্বাচন বানচালের কোনো অপচেষ্টাই সফল হবে না। ভোটার এবং প্রার্থীরা যেন সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ সচেষ্ট।’


-20251214185521.webp)


