× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২৬, ০৬:৫০ এএম

সমুদ্রের গভীরে জমছে বিপদের বীজ

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২৬, ০৬:৫০ এএম

সমুদ্রের গভীরে জমছে বিপদের বীজ

মে মাসের দগ্ধ গরমে দেশের মানুষ যখন হাঁসফাঁস করছে, ঠিক তখনই আবহাওয়াবিদদের নতুন সতর্কবার্তা আরও উদ্বেগ ছড়িয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে অস্বাভাবিক উষ্ণ পানির প্রবাহ তৈরি হওয়ায় আবারও শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’র আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিলে আগামী কয়েক বছরে বিশ^জুড়ে রেকর্ড তাপমাত্রা, দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল, বন্যা ও খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবী এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। তার ওপর যদি শক্তিশালী এল নিনো সক্রিয় হয়, তা হলে প্রকৃতির ভারসাম্যে আরও বড় ধাক্কা লাগবে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। সমুদ্রের গভীরে জমছে বিপদের বীজ : বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এই নতুন শঙ্কার কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘কেলভিন ঢেউ’। এটি মূলত সমুদ্রের গভীরে তৈরি হওয়া বিশাল উষ্ণ পানির স্রোত, যা প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়। বর্তমানে কিছু অঞ্চলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় সাড়ে সাত ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে। এই উষ্ণ পানির ঢেউ ধীরে ধীরে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে পৌঁছালে গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা পানি ওপরে ওঠার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠ দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠে এবং শুরু হয় এল নিনো। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, বর্তমানে যে গতি ও মাত্রায় সমুদ্র উষ্ণ হচ্ছে, তা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী সুপার এল নিনোতে রূপ নিতে পারে।

সুপার এল নিনো আসলে কী? : এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এটি দেখা দেয়। কিন্তু যখন এই উষ্ণতা অত্যন্ত বেশি হয়ে যায় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ের তুলনায় প্রায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বেড়ে যায়, তখন তাকে বলা হয় ‘সুপার এল নিনো’। গত দেড় শ বছরে মাত্র কয়েকবার এমন শক্তিশালী এল নিনো দেখা গেছে। ১৯৮২, ১৯৯৭ ও ২০১৫ সালের এল নিনো ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। বিশেষ করে ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনো বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনে। সেই সময় খরা, বন্যা ও দুর্ভিক্ষে বহু দেশ বিপর্যস্ত হয়েছিল। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ১৮৭৭-৭৮ সালের এল নিনো। ইতিহাসবিদ ও জলবায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, সেই সময় বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ ও খরায় কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

বদলে যাচ্ছে বৃষ্টি ও বাতাসের পথ : সাধারণ অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে বাণিজ্যিক বায়ু প্রবাহিত হয়। এই বাতাস দক্ষিণ আমেরিকার দিকের ঠান্ডা পানি সরিয়ে উষ্ণ পানিকে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। ফলে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু এল নিনোর সময় এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন পশ্চিম দিকে জমে থাকা উষ্ণ পানি আবার পূর্ব দিকে সরে যেতে শুরু করে। ফলে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের সমুদ্র উষ্ণ হয়ে ওঠে এবং বৃষ্টিপাতের ধরন পাল্টে যায়। এর প্রভাব পড়ে পুরো পৃথিবীর আবহাওয়ায়। কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দেয়, আবার কোথাও দীর্ঘ খরা ও তীব্র গরম তৈরি হয়।

দাবানল ও খরার নতুন আশঙ্কা : বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে দাবানল বেড়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আফ্রিকা ও এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় এ বছর আগের চেয়ে অনেক বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুপার এল নিনো তৈরি হলে অস্ট্রেলিয়া, আমাজন অঞ্চল, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু এলাকায় ভয়াবহ দাবানল দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে খরা পরিস্থিতিও আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ইতোমধ্যে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। তেলেঙ্গানায় তাপপ্রবাহে কয়েকজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সমুদ্র উষ্ণ হওয়ার বিপদ : জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর অতিরিক্ত তাপের বড় অংশ সমুদ্র শোষণ করে নেয়। কিন্তু সমুদ্রের তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে সেটি আর ভারসাম্য ধরে রাখতে পারে না। সমুদ্র উষ্ণ হলে ঝড়ের শক্তি বাড়ে, অতিবৃষ্টি বৃদ্ধি পায় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ অঞ্চলগুলোতে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা : বিশ্বের বিভিন্ন আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইতোমধ্যে সতর্কবার্তা দিয়েছে। তারা বলছে, চলতি বছরের শেষের দিকে এল নিনো আরও শক্তিশালী হতে পারে। কিছু পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, এটি ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলোর একটি তৈরি করতে পারে। বৈশি^ক গড় তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড স্পর্শ করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনো এক সঙ্গে কাজ করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কারণ পৃথিবী আগে থেকেই অতিরিক্ত উষ্ণ। তার ওপর সমুদ্র থেকে বাড়তি তাপ বায়ুম-লে ছড়িয়ে পড়লে গরম আরও তীব্র হয়।

সামনে কী অপেক্ষা করছে : আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, এখনই আতঙ্কিত হওয়ার সময় নয়, তবে সতর্ক হওয়ার সময় অবশ্যই এসেছে। কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও দুর্যোগ প্রস্তুতিতে আগাম পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী কয়েক মাসই বলে দেবে এল নিনো কতটা শক্তিশালী হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, পৃথিবী হয়তো আরও একটি কঠিন উষ্ণ সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তীব্র গরম, অনাবৃষ্টি, দাবানল, খরা ও অস্বাভাবিক আবহাওয়ার এই আশঙ্কার মধ্যে প্রশ্ন একটাইÑ প্রকৃতির এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বিশ্ব কতটা প্রস্তুত?

বাংলাদেশে কী প্রভাব পড়তে পারে : বাংলাদেশে এল নিনোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে। আবহাওয়াবিদদের মতে, শক্তিশালী এল নিনো সক্রিয় হলে বর্ষায় বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘ ও তীব্র হতে পারে। গত বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা তাপপ্রবাহ দেখা গিয়েছিল। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। অনেক এলাকায় কৃষিজমিতে ফাটল ধরে, পুকুর-খাল শুকিয়ে যায় এবং পানির সংকট তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এবার যদি সুপার এল নিনো তৈরি হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্যের দামও বেড়ে যেতে পারে। ধান, গম, ভুট্টা ও শাকসবজির উৎপাদন কমে গেলে তার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। একই সঙ্গে গরমজনিত অসুস্থতা, পানিশূন্যতা ও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়বে।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!