× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬, ০৭:০২ এএম

আশ্রয়ের পৃথিবীতে নীড়াশ্রয়ে মানুষ

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬, ০৭:০২ এএম

আশ্রয়ের পৃথিবীতে নীড়াশ্রয়ে মানুষ

বিশ্বজুড়ে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে কোটি কোটি মানুষ ঘরছাড়া হচ্ছে; অন্যদিকে উন্নত বিশ্ব একে একে বন্ধ করে দিচ্ছে তাদের সীমান্তের দরজা। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ব্রিটেনÑ সবখানেই এখন কঠোর হচ্ছে অভিবাসন ও আশ্রয়নীতি। ফলে নিরাপদ জীবনের আশায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া লাখো মানুষ গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীতে ১১ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছে। গত এক দশকে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এদের বড় অংশ যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা জলবায়ু দুর্যোগের শিকার। কিন্তু আশ্রয়ের সন্ধানে সীমান্ত পেরোতে গেলেই তাদের সামনে এখন দাঁড়িয়ে যাচ্ছে কাঁটাতারের বেড়া, কঠোর আইন আর দীর্ঘ অনিশ্চয়তা। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বিশ্ব শরণার্থী সংকট ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় দেশগুলো ক্রমেই মানবিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে সীমান্তরক্ষা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রতিবেদনের সহসম্পাদক জার্মান গবেষক পেত্রা বেন্ডেল সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ভবিষ্যৎ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন আশ্রয়কাঠামো আগামী ১২ জুন থেকে কার্যকর হচ্ছে। এই আইনের আওতায় সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বড় বড় আবাসনকেন্দ্র তৈরি করা হবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এসব কেন্দ্র কার্যত বন্দিশিবিরে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব মানুষের আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হবে, তাদের ইউরোপের বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে। সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে আলোচনায় রয়েছে তিউনিসিয়া, মিশর, রুয়ান্ডা ও উগান্ডার নাম। ইউরোপীয় নেতাদের যুক্তি, এতে অবৈধ অভিবাসন কমবে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এটি আসলে শরণার্থী সমস্যাকে অন্য দেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল।

আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের পরিস্থিতি এখন এই সংকটের বড় উদাহরণ। তালেবান শাসনের পর বহু আফগান নিরাপত্তার আশায় ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পুনর্বাসন কর্মসূচি স্থগিত হয়ে যাওয়ায় অনেকে পাকিস্তানে আটকা পড়েছেন। তাদের অনেকেই চরম অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। জার্মানির অভিবাসন গবেষক ফ্রাংক ড্যুফেল মনে করেন, নতুন ইউরোপীয় নীতির ফলে শিশু, নারী ও পরিবারের অধিকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, সংকটের সময় মানবিকতার বদলে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তবে ইউরোপের সরকারগুলো বলছে, আশ্রয়প্রার্থীর চাপ কমাতেই এই কঠোরতা প্রয়োজন। জার্মানির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যেখানে ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন, সেখানে দুই বছর পর সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজারে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে আবেদন আরও কমেছে। ইউরোপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রেও অভিবাসন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, তথাকথিত ‘তৃতীয় বিশ্বের’ দেশগুলো থেকে অভিবাসন স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। যদিও কোন দেশগুলো এই তালিকায় থাকবে তা স্পষ্ট করা হয়নি, তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোই মূল লক্ষ্য। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য এই সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। ইতোমধ্যে একাধিক দেশের নাগরিকদের ওপর পূর্ণ বা আংশিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আফগানিস্তান, ইরান, সোমালিয়া, সুদান, ইয়েমেন, লিবিয়াসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের প্রবেশ কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছে। শুধু নতুন আবেদনকারী নয়, গ্রিনকার্ডধারীদের ক্ষেত্রেও বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। আবেদন যাচাই, নিরাপত্তা পরীক্ষা ও ভ্রমণ প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর ফলে বহু পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। ব্রিটেনও আশ্রয়নীতিতে বড় পরিবর্তন আনছে। দেশটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শরণার্থী মর্যাদা আর স্থায়ী থাকবে না। আগে পাঁচ বছর পর স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ মিললেও এখন সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ২০ বছর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রতি আড়াই বছর পরপর শরণার্থীদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, যারা কাজ করতে সক্ষম হয়েও কাজ করবে না অথবা আইন ভঙ্গ করবে, তাদের রাষ্ট্রীয় সহায়তা কমিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এতে অভিবাসীদের প্রতি বিদ্বেষ ও বর্ণবাদ আরও বাড়বে। কানাডাও সম্প্রতি নতুন অভিবাসন আইন কার্যকর করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ২০২০ সালের পর যারা দেশটিতে প্রবেশ করেছেন এবং এক বছরের বেশি সময় পার করেছেন, তারা আর সহজে শরণার্থী আবেদন করতে পারবেন না। এর ফলে বাংলাদেশিসহ প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। শুধু পশ্চিমা বিশ্ব নয়, এশিয়ার বিভিন্ন দেশও বাংলাদেশিদের জন্য ভিসানীতি কঠোর করছে। ইন্দোনেশিয়া অন-অ্যারাইভাল সুবিধা বন্ধ করেছে। ভিয়েতনাম ট্যুরিস্ট ভিসা দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে।

থাইল্যান্ডেও ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারেও দেখা দিয়েছে সংকট। সৌদি আরব, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে মানব পাচার, অবৈধ অবস্থান এবং ভিসার অপব্যবহার। ফলে সাধারণ ভ্রমণকারী, শিক্ষার্থী ও শ্রমিকেরাও এখন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের বড় অংশ নিজেদের দেশেই আশ্রয়হীন অবস্থায় রয়েছেন। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ প্রতিনিয়ত ঘরবাড়ি হারাচ্ছেন। খরা, বন্যা ও খাদ্যসংকট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। রোহিঙ্গা সংকটও এখনো বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা লাখো রোহিঙ্গা বহু বছর ধরে কক্সবাজারের শিবিরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় তাদের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিশ্ব এখন এমন এক সময়ে পৌঁছেছে যেখানে মানবিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। উন্নত রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপের কথা বলছে, আর দরিদ্র দেশগুলো বহন করছে বাস্তুচ্যুত মানুষের সবচেয়ে বড় বোঝা।

তাদের মতে, শুধু সীমান্ত বন্ধ করে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। যুদ্ধ বন্ধ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। কারণ মানুষ যখন বাঁচার জন্য ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়, তখন কাঁটাতারের বেড়া কিংবা কঠোর আইন তাদের থামাতে পারে না, বরং আরও অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পথে ঠেলে দেয়। বিশ্বজুড়ে কঠোর হয়ে ওঠা অভিবাসননীতি তাই এখন শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি মানবতা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!