ভুয়া খবর ছড়িয়ে রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার ব্যাংকে আবারো অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নামসর্বস্ব অনলাইন পত্রিকা ও ভুয়া ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে এই অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী ও পরবর্তী একটি সুবিধাভোগী চক্র তাদের প্রভাব ও সুবিধা অক্ষুণœ রাখার চেষ্টায় এ অস্থিরতা তৈরিতে ইন্ধন দিচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যাংকগুলোর দায়িত্বশীল সূত্রের।
সম্প্রতি রাষ্ট্রমালিকানাধীন বৃহত্তম সোনালী ব্যাংক পিএলসি, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, জনতা ব্যাংক পিএলসি এবং রূপালী ব্যাংক পিএলসির এমডি অ্যান্ড সিইওদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে একযোগে একাধিক বেনামী ফেসবুক পোস্ট ও ভুঁইফোড় অনলাইন নিউজের লিংক এসব ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া বর্তমান সরকারি ব্যাংকগুলোর এমডিদের দ্রুত অপসারণ করা হচ্ছে বলে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। যার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে। তবে এসব তথ্যকে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন প্রোপাগান্ডা বলে দাবি করেছে ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংঘবদ্ধভাবে এসব অপপ্রচার ছড়ানোর পেছনে ইন্ধন রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কিছু শীর্ষ পর্যায়ের নির্বাহী ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের। যারা এর আগে স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের সময়েও সুবিধাভোগী, এখন নতুন করে ভোল পাল্টে ক্ষমতাসীন দলের হিসেবে নিজেদের জাহির করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের একাধিক জেনারেল ম্যানেজার ও ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই ব্যাংকগুলোতে দক্ষতা ও যোগ্যতাভিত্তিক নেতৃত্ব পদায়নের অংশ হিসেবে সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংকে নতুন ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিয়োগ দেয়। সূত্র মতে, ৫ আগস্ট-পরবর্তী দেশব্যাপী বিশেষত অর্থনৈতিক খাতের যে নৈরাজ্য এবং ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়, সে থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ব্যাংকটিকে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় রেখেছেন সোনালী ব্যাংকের নতুন এমডি শওকত আলী খান। তিনি দায়িত্ব নিয়েই সব শীর্ষ নির্বাহীকে নিয়ে ব্যাংকের বিশৃঙ্খলা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ ও বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু ৫ আগস্ট-পূর্ববর্তী ব্যাংকে যেসব নির্বাহী ও গ্রুপ সরকারদলীয় পরিচয়ে বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করত ও দাবি-দাওয়া আদায় করত তারাই ৫ আগস্টের পর কিছুদিন চুপ থেকে ভোল পাল্টে বিএনপিদলীয় পরিচয়ে মাঠে নামেন। একইভাবে অন্য এমডিরাও ব্যাংকগুলোকে স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখছেন।
সোনালী ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানায়, নতুন করে গজিয়ে ওঠা সরকারদলীয় কিছু সংগঠনের পরিচয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত বিভিন্ন অনৈতিক দাবি-দাওয়া নিয়ে ধারণা দিতে শুরু করেন। সৎ ও নিরীহ বিভিন্ন কর্মকর্তাকে হয়রানির উদ্দেশ্যে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বদলি আতঙ্ক তৈরি করেন। এতে ব্যাংকে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়। তিনি কঠোরভাবে পরিস্থিতি শান্ত করে ব্যাংকে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনেন।
এছাড়াও দীর্ঘদিনের পদোন্নতি না হওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে সাধারণ কর্মকর্তাদের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়তে থাকে। শওকত আলী খান ব্যাংকের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর ও দূরদর্শী কিছু সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দারুণভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসেই বড় সংখ্যায় পদোন্নতি প্রদান, পুরোনো বিতর্কিত সাংগঠনিক কাঠামো বাতিল করে সময়োপযোগী সাংগঠনিক কাঠামো প্রণয়ের উদ্যোগ নেন। সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের বিদ্যমান সেবার পরিধি বৃদ্ধি, শাখার সংখ্যা বৃদ্ধিসহ ব্যাংকের ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। তার নেতৃত্বে ২০২৫ সাল ও ২০২৬ সাল শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে রেকর্ড মুনাফা লাভ করে সোনালী ব্যাংক। প্রথমবারের মতো নিট প্রফিট লাভ ছাড়াও মূলধন ঘাটতি শূন্যে নামিয়ে আনে। পাস হয় তিন বছর মেয়াদি নতুন সাংগঠনিক কাঠামো।
জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক সূত্র জানায়, এসব ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত এমডিরা দায়িত্ব নিয়েই বিভিন্ন বৈষম্য ও অস্থিরতা কমিয়ে কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনেন। এজন্য তারা চিহ্নিত সিন্ডিকেট ভেঙে দেন ও অভিযুক্তদের বদলি করেন। এতে কাজের পরিবেশ স্থিতিশীলসহ শৃঙ্খলা ফিরে আসে। তবে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেশি থাকায় সোনালী ব্যাংক ব্যতীত বাকি ব্যাংকগুলো বছর শেষে কোনো মুনাফা লাভ করতে পারেনি। তবে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সূচককে উন্নত করার প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা গেছে। এখন যদি আবার নানা গুজব ছড়িয়ে এসব এমডিদের পরিবর্তন করা হয়, তা হলে আবার নতুন করে অস্থিরতা তৈরির শঙ্কার কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্যাংক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহল মন করছে, কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী যে নৈরাজ্যের চেষ্টা ও অনলাইনে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে এটাও তারই অংশ। ব্যাংকগুলোর এমডিদের নেতৃত্বে ব্যাংকগুলো যখন প্রায় স্বাভাবিক, অর্থনীতি নিয়ে মানুষের মধ্যকার ভীতি যখন প্রায় থিতিয়ে এসেছে, তখন এই অপতৎপরতা ব্যাংক খাতকে আবার অস্থির করে তুলতে পারে। দেশের আর্থিক অবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার প্রাক্কালে সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক নিয়ে অপপ্রচার ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করছে ব্যাংকগুলোতে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী সরকারের অনুগামী কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা। এদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করেন সাধারণ কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব ব্যাংকের একাধিক ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যারা এমডি এবং ডিএমডি হিসেবে নিয়োগ পান তারা পূর্ববর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকে থাকাকালে রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় বিভিন্ন দিবসে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভিন্ন অনুষ্ঠান-আয়োজনে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে ওই সব আয়োজনের ছবি ও ভিডিও খ-িত আকারে প্রচার করে প্রোপাগান্ডা শুরু করেছেন। এমনকি এসব ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণভাবে শীর্ষ নির্বাহীদের ব্লাকমেইলিং করছেন। তাদের দাবি, অনলাইনে যে প্রোপাগান্ডা চলছে এগুলো ভিত্তিহীন। এসবে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। বর্তমান সরকারের গৃহীত উদ্যোগ বাস্তবায়নে সোনালী ব্যাংকসহ রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ওপর অর্পিত ভূমিকা যথাযথভাবে পালনসহ দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সরকারের সহযোগী হিসেবে ব্যাংকগুলো কাজ করে যাচ্ছে। তারা জানান, বর্তমান এমডিদের নিয়ে যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, এর ফলে ব্যাংকগুলোতে কাজের স্বাভাবিকতা কিছুটা থমকে গেছে। ব্যাংক খাতকে স্বাভাবিক রাখতে তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের উচিত এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা।
সোনালী ব্যাংকের এমডি শওকত আলী খান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সবকিছু যাচাই-বাছাই করেই আমাকে এমডি করা হয়েছে। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী গ্রুপ এখন বিভিন্ন গুজব ও অপপ্রচার চালাচ্ছে। যে কারণে ব্যাংকের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন