ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বা ইন্টারনাল অডিট ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনায় অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, কমপ্লায়েন্স ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করা হয়েছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ আগের চেয়ে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো সব ব্যাংকে হুইসেলব্লোয়ারের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দুর্নীতি বা গুরুতর অনিয়মে জড়িত থাকলে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষকেরা সেই তথ্য গোপনে সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি লাগবে না।
গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা (ইন্টারনাল কন্ট্রোল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম-আইসিএমএস) নির্দেশনা জারি করেছে। এর মাধ্যমে ২০১৬ সালের ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন (গাইডলাইনস অন ইন্টারনাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স ইন ব্যাংকস) নির্দেশনা বাতিল করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ২০১৬ সালের নির্দেশনা তখনকার তদারকি ব্যবস্থার জন্য উপযোগী ছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশ ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (রিস্ক বেইজড সুপারভিশন-আরবিএস) চালু করেছে। তাই নতুন তদারকি ব্যবস্থার সঙ্গে মিল রেখে নির্দেশনা পরিবর্তন করা হয়েছে। তিনি বলেন, নতুন নির্দেশনায় অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, কমপ্লায়েন্স ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা নির্দেশনা থাকবে, এই নির্দেশনায় মূলত অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও কমপ্লায়েন্স কীভাবে পরিচালিত হবে, তা বলা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা জানান, নতুন নির্দেশনার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও কমপ্লায়েন্সকে আলাদা করা। আগে একজন হেড অব আইসিসি দুই বিভাগের দায়িত্ব পালন করতেন। এখন থেকে হেড অব ইন্টারনাল অডিট ও হেড অব কমপ্লায়েন্স আলাদা ব্যক্তি হবেন এবং তাদের পদমর্যাদাও সমান থাকবে। ফলে নিরীক্ষায় কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ কমে যাবে।
তিনি আরও বলেন, হেড অব ইন্টারনাল অডিট সরাসরি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অডিট কমিটির কাছে রিপোর্ট করবেন। আগে তাকে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাজ করতে হতো। এখন তিনি আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন।
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ধরা পড়লে তা গোপনীয়ভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক তদারকি বিভাগে জানাতে হবে। ২০১৬ সালের নির্দেশনায় এমন বিধান ছিল না। এ ছাড়া প্রতিটি ব্যাংককে অভিযোগ গ্রহণের জন্য হটলাইন, ই-মেইল, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা সিলগালা লিখিত অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে। হুইসেলব্লোয়ারের পরিচয় গোপন রাখতে হবে এবং পর্যাপ্ত তথ্য থাকলে বেনামি অভিযোগও তদন্ত করতে হবে। অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে পদাবনতি, সাময়িক বরখাস্ত বা হয়রানির মতো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ফরেনসিক, কনকারেন্ট ও ভার্চুয়াল অডিট : নতুন নির্দেশনায় ফরেনসিক, কনকারেন্ট ও ভার্চুয়াল অডিট চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে জালিয়াতির তদন্ত করে আদালতে ব্যবহারযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে। কনকারেন্ট অডিটে লেনদেন চলার সময়ই নিয়মিত নজরদারি করা হবে। আর ভার্চুয়াল অডিটের মাধ্যমে দূর থেকে নিরাপদভাবে অডিট পরিচালনা করা যাবে।
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি : ব্যাংকগুলোকে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আওতায় বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার শনাক্তকরণ, ঋণঝুঁকি, বাজারঝুঁকি, কাউন্টারপার্টি ঝুঁকি, সাইবার নিরাপত্তা ও জালিয়াতি প্রতিরোধে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। সব তপশিলি ব্যাংককে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক পরিবর্তন সম্পন্ন করে নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

