ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

একনেকে ১৪ হাজার কোটির আট প্রকল্প অনুমোদন

রূপালী প্রতিবেদন
প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ০৫:৫৯ এএম

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মোট ১৪ হাজার ৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ের আটটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে তিনটি নতুন এবং পাঁচটি সংশোধিত প্রকল্প। এসব প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১০ হাজার ৪৯৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা, বৈদেশিক ঋণ ৩ হাজার ৫৫০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভার কক্ষে অনুষ্ঠিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম এবং বর্তমান সরকারের ষষ্ঠ একনেক সভায় এসব প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে চীনের অর্থায়নে নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ ৮০ শতাংশ শেষ হওয়ার পরও ব্যয় এক লাফে ৫৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে এসে এই প্রশ্নের মুখে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, এখানে আসলে ঢাকা-আশুলিয়া যে প্রকল্পের খরচটা এখন বেড়েছে, তার দুটো কারণ আছে। একটা হচ্ছে মূলত ডলার রেটে একটা বড় আকারে পরিবর্তন ঘটেছে। সেই ডলারের পরিবর্তনের কারণেই আবার কতগুলো ভ্যাট, ট্যাক্সসহ বেশ কিছু পরিবর্তনের জায়গা আছে।

অপর কারণটির ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, এখানে নতুন একটা অঙ্গ সংযোজন হয়েছে। তো সেই অঙ্গ সংযোজনের ফলেও খরচের একটি বৃদ্ধি আছে। আর কিছু ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর, যেটা মূল ডিপিপিতে সেখানে ছিল না, যার ফলে ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরে একটা খরচ বেড়েছে, আর পাঁচটি নতুন অঙ্গ সংযোজনের খরচ বেড়েছে। এ দুটোই আসলে মূলত খরচ বৃদ্ধি। বাকিটা মূলত ডলারের রেট সমন্বয় এবং তদানুযায়ী যে ভ্যাট-ট্যাক্সের হিসাব, সেটা।

২০১৭ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা; এর মধ্যে চীনের অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে ওই বছরের জুনেই প্রকল্প প্রস্তাবে প্রথম সংশোধনী আনা হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় ৬৫২ কোটি টাকা বেড়ে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা দাঁড়ায়। তবে ওই সময় চীনের অর্থায়নের পরিমাণ কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা।

তবে গতকাল বৈঠকে অনুমোদিত নতুন প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নে ‘বৃহত্তর দিনাজপুর (দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়) জেলা সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প’। ১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিন জেলার গ্রামীণ যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কর্মকা- সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ২ হাজার ৮২ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ের ‘পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্প’ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জুলাই ২০২৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের আওতায় দেশের ৮ বিভাগের ৬৪ জেলার ৪৯৫টি উপজেলায় ৯১ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার পল্লি সড়ক নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি পরিবারপ্রধান ৪৫ হাজার ৭৮০ জন দুস্থ নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আওতায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান ও উৎপাদন কোম্পানি (বাপেক্স) এবং পেট্রোবাংলার উদ্যোগে ৭২৯ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ের ‘একটি মূল্যায়ন কূপ (বেগমগঞ্জ-৫) এবং দুটি অনুসন্ধান কূপ (বেগমগঞ্জ-৬ ও সুনেত্র-২) খনন’ প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পটি সরকারি ও সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে।

সভায় এলজিইডির ‘সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২ (জিএসআইডিপি-২)’ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পটির ব্যয় ৩৬৮ কোটি টাকা বেড়ে ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এছাড়া ‘দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী অনুমোদনের মাধ্যমে ব্যয় ১ হাজার ২৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সংশোধিত প্রকল্পের আওতায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে।

সবচেয়ে বড় সংশোধনী অনুমোদন পেয়েছে ‘ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্প’। দ্বিতীয় সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পটির ব্যয় ৯ হাজার ৪৯২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বেড়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৪৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সংশোধিত প্রকল্পে সরকারি অর্থায়ন ১৩ হাজার ৮০৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ১৩ হাজার ২৪২ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

একনেক সভায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ‘বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প, সিলেট বিভাগ’-এর তৃতীয় সংশোধনীও অনুমোদিত হয়েছে। এই সংশোধনের ফলে প্রকল্পটির ব্যয় ১১৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা কমে এসেছে।

একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতায় ‘মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসমূহে বিদ্যমান কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং জেলা সদর হাসপাতালসমূহে ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন’ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পটির ব্যয় ৮১ কোটি ৩১ লাখ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবারের একনেক সভায় উপস্থাপিত প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে গ্রামীণ যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার উন্নয়ন, জ¦ালানি অনুসন্ধান এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একনেকের অনুমোদন মিললে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করবে।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির; আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু; বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ; পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহিদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম; পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা।