ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বাঙালির অস্তিত্বের মাস ভাষার মাস

মাইনুল হক ভূঁইয়া
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬, ১১:৩২ পিএম

ফেব্রুয়ারি মাস ভাষার মাস। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অস্তিত্বের মাস। এই মাস এলেই মনে পড়ে বায়ান্নোর কথা যে বায়ান্নো আপন অস্তিত্ব রক্ষায় অজ¯্র রক্ত ঝরিয়েছে, অকাতরে কেড়ে নিয়েছে সালাম-জব্বার-বরকত-রফিকসহ অসংখ্য তাজা প্রাণ। বাঙালির রক্ত, মুষ্টিবদ্ধ হাত আর আগুন ঝরানো সংগ্রাম ফেব্রুয়ারিকে করেছে মহিমান্বিতÑ বাংলাকে দিয়েছে অনন্য ভাষার মর্যাদা। এই মাস তাই বাঙালির অতি আদরণীয় ও পূজনীয়।

এই মাস এলেই বাঙালি যেন নতুন করে জেগে ওঠেÑ বাঙালির মন-প্রাণে যেন জাগরিত হয় নতুন প্রাণস্পন্দন। এই মাস তাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়Ñ শক্তি জোগায় বাংলাকে শক্ত করে বুকে ধারণ করতে। আর এই মাস এলেই সবাই নব-উদ্যমে জেগে ওঠেÑ রক্তে শিহরণ জাগে, বপিত হয় নব-উদ্দীপনার বীজ। বাংলাকে তাই আর কেড়ে নিতে পারে নাÑ বায়ান্নোর আগে যেভাবে চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু বর্গীরা পারেনি, পারেনি বাঙালির ইস্পাত-কঠিন দৃঢ়তার কারণে। তাদের সেই দৃঢ়তায় বানের জলে ভেসে যায় চাপিয়ে দেওয়া উর্দু নামের পরভাষা। আর এরই ধারাবাহিকতায় রক্তে রঞ্জিত পথ বেয়ে বেয়ে বাঙালি একদিন স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে। আসে ’৭১।

নিরস্ত্র বাঙালির নয় মাসের সশস্ত্র লড়াই, অভূতপূর্ব আত্মবলিদান তাদের ষোলো ডিসেম্বরে পৌঁছে দেয়। অবশেষে চূড়ান্ত বিজয়ের স্বাদ গায়ে মেখে বাঙালি সেদিন ঘরে ফিরে আসে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটাকে গড়তে এরপর বাঙালির শুরু হয় নতুন যুদ্ধ। যুদ্ধই যেন বাঙালির নিয়তিÑ এই যুদ্ধ করেই বাঙালি আজও টিকে আছে, টিকে আছে সগৌরবে আপন মহিমায়। বাংলা তারা কাউকে ইজারা দেয়নিÑ দেয়নি বাংলার মর্যাদা লুণ্ঠিত হতে। এই ফেব্রুয়ারি, এই ভাষার মাস তাদের কাছে তাই প্রাণের চেয়েও প্রিয়। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি এলেই বাঙালির নতুন স্পন্দনে স্পন্দিত হয় সবার মন-প্রাণ। তারা নকশা করেÑ পরিকল্পনা করে নানা রঙে, নানা ঢঙে পুরো মাসটিকে মর্যাদা দিতে। ভাষা শহিদদের স্মৃতিস্তম্ভ শহিদ মিনার ফিরে পায় প্রাণচাঞ্চল্যÑ শুরু হয় ঘষা-মাজা, দেওয়া হয় নতুন রঙের প্রলেপ। বাংলা একাডেমিতে শুরু হয় মাসজুড়ে বইমেলা।

এই মেলা বাংলা ভাষাভাষীদের দেয় নতুন ‘অক্সিজেন’। তারা জেগে ওঠে নব-উদ্যমে। পুরো মাস নানা সভা হয়, সেমিনার হয়, শোকার্ত মানুষ বুকে ধারণ করে কালো ব্যাজ। একুশের প্রথম প্রহরে প্রভাত ফেরি হয়Ñ নগ্নপায়ে শোকার্ত মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত ও আলতাফ মাহমুদ সুরারোপিত অমর সংগীতের পঙতিমালাÑ ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...’।

শহিদ মিনারকে গন্তব্য ধরে নিয়ে প্রভাত ফেরির এই সশ্রদ্ধ উচ্চারণ ভোরের আকাশ-বাতাসকে আন্দোলিত করে। পুরোটা সময় তৈরি হয় এক অদ্ভুত শোকাবহ আবহ। হয়তোবা এই কারণেই ভাষা শহিদদের আত্মারাও পায় অনাবিল প্রশান্তি। ফেব্রুয়ারি তাই আজ এক অনন্য উচ্চতায় আসীন। শোক-শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যে প্রতিবছর বাঙালি জাতি ফেব্রুয়ারিকে স্মরণ করে।